তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ব্রিটেনে তরুণদের বেকারত্ব মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা, কর্মসংস্থানের দায়িত্ব পাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন

ব্রিটেনে তরুণদের বেকারত্ব মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা, কর্মসংস্থানের দায়িত্ব পাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২ নভেম্বর :

ব্রিটেনে তরুণদের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা তরুণদের কাজে ফেরাতে স্থানীয় কাউন্সিল ও আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষকে সরাসরি অর্থায়ন এবং কর্মসূচি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ আসছে নতুন এক সরকারি পর্যালোচনায়।

সাবেক লেবার সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালান মিলবার্নের নেতৃত্বে পরিচালিত যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক পর্যালোচনায় (Milburn Review) এসব প্রস্তাব উঠে আসার কথা জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস ও দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। প্রতিবেদনটি নভেম্বর মাসে প্রকাশের কথা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সুপারিশ ও সরকারের সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।

প্রায় ১০ লাখ তরুণ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাইরে

ব্রিটেনে বর্তমানে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ১০ লাখ তরুণ শিক্ষা, চাকরি কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। এদের বলা হয় এনইইটি (NEET)। অর্থাৎ তারা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে না, চাকরি করছে না এবং পেশাগত প্রশিক্ষণেও অংশ নিচ্ছে না।

পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত বেকারত্বের সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের বাইরে থাকলে তরুণদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ কমে যায়।

মিলবার্নের পর্যালোচনায় তরুণদের কর্মসংস্থানে ফেরাতে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসনের হাতে বাড়তি ক্ষমতা

প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় কাউন্সিল ও আঞ্চলিক প্রশাসনকে তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। কোন এলাকায় কী ধরনের চাকরির সুযোগ রয়েছে, কোথায় প্রশিক্ষণ প্রয়োজন এবং কোন তরুণ কী ধরনের সহায়তা চান—এসব বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয়ভাবে কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।

পরিকল্পনায় একটি অংশগ্রহণমূলক কর্মসংস্থান কর্মসূচির কথাও রয়েছে। এর আওতায় তরুণদের চাকরি, শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ অথবা পেশাগত শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে। তবে এসব সুযোগ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট তরুণদের নির্ধারিত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে।

এ ছাড়া স্কুল পর্যায় থেকেই, বিশেষ করে ১৪ বছর বয়স থেকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পেশা ও কর্মজীবন সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

ভাতাভোগীদের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে?

নতুন পরিকল্পনায় ইউনিভার্সাল ক্রেডিটসহ সরকারি সহায়তা গ্রহণকারী কর্মহীন তরুণদের চাকরি বা প্রশিক্ষণে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সব ভাতাভোগীর জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

সরকার ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডে ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সীদের জন্য ইয়ুথ গ্যারান্টি কর্মসূচি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি অথবা চাকরি খুঁজতে সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের শরৎকাল থেকে ইউনিভার্সাল ক্রেডিট গ্রহণকারী এবং অন্তত ১৮ মাস ধরে চাকরি খুঁজছেন—এমন যোগ্য ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের জন্য ছয় মাসের বেতনভুক্ত চাকরির সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টা কাজের ব্যবস্থা থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাকে বেতন ভর্তুকি দেওয়া হবে।

ব্রিটিশ- বাংলাদেশি তরুণদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের জন্যও এ উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, রেডব্রিজ ও আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী যেসব তরুণ পড়াশোনা শেষ করেও উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেও চাকরির অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ এবং নিয়োগদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়েন। কারও ক্ষেত্রে ইংরেজিতে পেশাগত যোগাযোগের দক্ষতা, কারও ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার অভাব কিংবা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সন্ধান না পাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশি অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সন্তানদের শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির দিকে ঠেলে না দিয়ে স্কুলজীবন থেকেই প্রযুক্তি, হিসাবরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, নির্মাণশিল্প ও অন্যান্য কারিগরি পেশার সঙ্গে পরিচিত করা দরকার।

একই সঙ্গে স্থানীয় কাউন্সিল, কলেজ, চাকরি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশি তরুণদের জন্য কর্মজীবনবিষয়ক পরামর্শ, শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ, চাকরির আবেদন ও সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং পেশাগত যোগাযোগ তৈরির সুযোগ বাড়ানো গেলে তাঁরা আরও বেশি উপকৃত হতে পারেন।

শুধু ভাতা নয়, প্রয়োজন কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—তরুণদের বেকারত্বের জন্য সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা যায় না। চাকরির অভাব, মানসম্মত প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং শিক্ষাগত বৈষম্য অনেককে কর্মজীবনের বাইরে রাখে।

তাই শুধু ভাতা কমানো বা চাকরি খোঁজার বাধ্যবাধকতা বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, বাস্তব কর্মসংস্থান, শিক্ষানবিশ পদ এবং নিয়োগদাতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

সরকারের প্রত্যাশা, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং অর্থনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়বে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণের মান এবং তরুণদের জন্য প্রকৃত চাকরির সুযোগ তৈরির ওপর।