‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

ট্রাম্পবিরোধী ভোটে সংগঠিত হচ্ছেন মার্কিন মুসলিমরা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে হতে পারে বড় প্রভাব

ট্রাম্পবিরোধী ভোটে সংগঠিত হচ্ছেন মার্কিন মুসলিমরা, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে হতে পারে বড় প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি, ১ নভেম্বর :

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে সংগঠিত হচ্ছেন দেশটির মুসলিম ভোটাররা। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে মুসলিম ভোটের প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা, মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন, ধর্মীয় নেতা ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি জোরদার করেছে। সংগঠনটির রাজনৈতিক সহযোগী সংস্থা সিএআইআর অ্যাকশনও এই উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে।

সিএআইআর ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক জরিপে জানিয়েছে, ৮৬১ জন মুসলিম ভোটারের মতামতের ভিত্তিতে দেখা গেছে, তাঁদের ৮৪ শতাংশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দায়িত্ব পালনে অসন্তুষ্ট। বিপরীতে মাত্র ৬ শতাংশ তাঁর কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা আগামী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করতে চান। রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন মাত্র ৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৮১ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা অবশ্যই ভোট দেবেন। আরও ৯ শতাংশ ভোট দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

তবে সিএআইআর সতর্ক করেছে, জরিপে প্রকাশিত ভোট দেওয়ার ইচ্ছাকে প্রকৃত নির্বাচনী উপস্থিতির পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

গাজা ও ইরান যুদ্ধ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু

জরিপে মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বড় প্রভাব উঠে এসেছে। ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, গাজা বিষয়ে কোনো প্রার্থীর অবস্থান তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথবা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে ৮১ শতাংশ চান, কংগ্রেস যেন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর উদ্যোগ আটকে দেয়।

এ ছাড়া ৮০ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব বেড়েছে। ৬৩ শতাংশের ধারণা, অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের তুলনায় মুসলিমরা ফেডারেল নাগরিক অধিকার আইনের সমান সুরক্ষা পাচ্ছেন না।

তবে অর্থনৈতিক বিষয়ও তাঁদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। জরিপে ৬৩ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ৪৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবার সুযোগকে দেশের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

১০ অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ

নির্বাচনের আগে মুসলিম ভোটারদের সংগঠিত করতে সিএআইআর ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন প্রচার এবং সরাসরি খুদে বার্তা পাঠানোর কর্মসূচি নিয়েছে।

সংগঠনটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়া, জর্জিয়া, ইলিনয়, মিশিগান, মিনেসোটা, নিউ জার্সি, নিউইয়র্ক, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস ও ভার্জিনিয়ায় প্রায় আড়াই লাখ ভোটারের কাছে খুদে বার্তা পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিন দফায় এসব বার্তার সংখ্যা সর্বোচ্চ সাড়ে সাত লাখ হতে পারে।

পাশাপাশি ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটারের কাছে পৌঁছানোর এবং টেলিভিশন প্রচারের মাধ্যমে প্রায় ৩ লাখ ১১ হাজার পরিবারের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি।

সিএআইআরের সরকারি সম্পর্কবিষয়ক পরিচালক রবার্ট এস ম্যাককাও ৩০ অক্টোবর এক বিবৃতিতে যোগ্য মুসলিম ভোটারদের নিবন্ধন যাচাই, ভোটকেন্দ্রের তথ্য সংগ্রহ এবং নির্দিষ্ট ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।

ধর্মীয় নেতাদেরও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান

মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে ধর্মীয় নেতারাও সক্রিয় হয়েছেন। ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইয়াসির কাদির একটি ভিডিও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তিনি মুসলমানদের জুমার নামাজ আদায়ের পর ভোট দিতে যাওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচনী পরিস্থিতি মার্কিন মুসলমানদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময় হতে পারে। দেশের অন্যান্য নাগরিকের মতো মুসলমানদেরও নিজেদের অধিকার ও নাগরিক দায়িত্ব পালনে সক্রিয় হতে হবে।

তাঁর বক্তব্যে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং বিশ্বজুড়ে গণহত্যার বিরোধিতা করেন—এমন প্রার্থীদের সমর্থন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মুসলিম ভোট কি পাল্টে দিতে পারে নির্বাচনের সমীকরণ?

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব আগের তুলনায় বেশি আলোচনায় আসছে। সিএআইআরের হিসাবে, দেশটিতে নিবন্ধিত মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। তাঁদের একটি বড় অংশ এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন, যেখানে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত কাছাকাছি হতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। ফলে অল্প ভোটের ব্যবধানেও কোনো কোনো আসনের ফলাফল বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে মিশিগান, জর্জিয়া ও পেনসিলভানিয়ার মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে মুসলিম ও আরব-আমেরিকান ভোটারদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

তবে মুসলিম ভোটাররা সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী নন। অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারও তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাই শুধু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতার লড়াই নয়; ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমর্থন কিংবা অসন্তোষেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। মুসলিম ভোটারদের এই সংগঠিত অংশগ্রহণ শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইকে কতটা কঠিন করে তোলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।