“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৭৩।। শ্রমিকের শ্রমে সবার সচ্ছলতা, শ্রমিকের ভাগ্যে শুধু সংকট—শুনবে কে?
উৎসর্গ
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সকল শ্রমজীবী মানুষের প্রতি।
তাঁদের ঘাম, শ্রম, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায়।

শ্রমিকের শ্রমে শিল্পের সমৃদ্ধি। শ্রমিকের ঘামে দেশের সচ্ছলতা। শ্রমিকের সাফল্যে রপ্তানির সম্প্রসারণ। সেই শ্রমিকের সংসারে সংকট। সন্তানের শিক্ষায় সংশয়। সংসারের সঞ্চয়ে শূন্যতা! সকাল থেকে সন্ধ্যা। শত শত সেলাই, সহস্র সেলাইয়ের সমাহারে সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের সুনাম। সমৃদ্ধ হয় অর্থনীতি। অথচ সেই শ্রমিকের সামান্য স্বস্তি, সম্মানজনক সংসার কিংবা সঙ্গতিপূর্ণ সম্মানী নিশ্চিত করতে সংকোচ, সংশয় ও সমঝোতার সংকট! প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমিকের শ্রমে সমৃদ্ধ দেশের সম্পদে শ্রমিকের সচ্ছলতার সংস্থান হবে না কেন?

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের শ্রমে সচল। দেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনীতিতে এই শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাঁদের বড় অংশের জীবন কাটে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর সংগ্রামে।
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি ৩০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে; ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.২২ শতাংশ।
১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার, আর সরকারি বেতন বাড়ে ১৪২ শতাংশ!
১২ হাজার ৫০০ টাকা মাসিক মজুরি মানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১৭ টাকা। এই অর্থে বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, যাতায়াত, সন্তানের শিক্ষা—সবকিছু সামলানো কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে ঢাকা ও শিল্পাঞ্চলের মতো ব্যয়বহুল এলাকায় এই আয় দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও কঠিন।
অন্যদিকে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব এসেছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে প্রায় ১৪২ শতাংশ। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনও দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এই বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের সব ধরনের মোট বেতনের ওপর ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি নয়; এটি সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতনের তুলনা।
নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। তাঁদের বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রায় ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্নে একই রকম গুরুত্ব দেওয়া হবে না কেন?
শ্রমিকের দাবি কি শিল্পের সামর্থ্যের বাইরে?
মালিকপক্ষেরও যুক্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ, ব্যাংকঋণের সুদ এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে কম দামে অর্ডার পাওয়ার চাপ—এসব কারণে অনেক কারখানা সংকটে থাকে। সব কারখানার আর্থিক সামর্থ্যও এক নয়।
কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির প্রশ্নকে শুধু উৎপাদন ব্যয়ের অজুহাতে পাশ কাটানো যায় না। শিল্পের মুনাফা, রপ্তানি আয় ও উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল শ্রমিকের জীবনেও পৌঁছাতে হবে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারাও কম দামে পণ্য কেনার পাশাপাশি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়াতে পারে না।
৩০ হাজার টাকা দাবি কেন আলোচনার যোগ্য?
৩০ হাজার টাকা দাবি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নির্ধারণ করতে প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যয়-সমীক্ষা। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি নির্ধারণ করা উচিত।
শুধু মালিকের সামর্থ্য কিংবা শ্রমিকের দাবিকে একমাত্র বিবেচ্য না করে শিল্পের প্রকৃত আয়, উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানি মূল্য এবং শ্রমিকের জীবনধারণের ব্যয়—সবকিছু বিশ্লেষণ করতে হবে। মজুরি এমন হতে হবে, যাতে শ্রমিক বেঁচে থাকার পাশাপাশি পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।
আন্দোলন দমনে নয়, শ্রমিকের আস্থা অর্জনে সমাধান
শ্রমিক অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান কেবল পুলিশি ব্যবস্থা বা কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারিতে সম্ভব নয়। শ্রমিকের ক্ষোভের কারণ চিহ্নিত করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ জরুরি।
১. স্বাধীন মজুরি কমিশন: শ্রমিক, মালিক, সরকার ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন মজুরি কমিশন গঠন করতে হবে। জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
২. ধাপে ধাপে মজুরি বৃদ্ধি: একবারে সব কারখানার ওপর চাপ সৃষ্টি না করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ধাপে ধাপে মজুরি বাড়ানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে সময়সূচি ও বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হতে হবে।
৩. মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরির সমন্বয়: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে শ্রমিকের মজুরি সমন্বয়ের নিয়ম চালু করতে হবে। কয়েক বছর পরপর নতুন করে আন্দোলনের অপেক্ষা করা উচিত নয়।
৪. আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়বদ্ধতা: বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের ন্যায্য ক্রয়মূল্য দিতে হবে। কম দামে অর্ডার দিয়ে উৎপাদন খরচের চাপ কারখানা ও শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
৫. শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তা: ন্যায্য মজুরির দাবি তোলার কারণে কোনো শ্রমিককে হয়রানি, চাকরিচ্যুত বা কালো তালিকাভুক্ত করা যাবে না। একই সঙ্গে কারখানার আর্থিক হিসাব ও উৎপাদন ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. আবাসন, চিকিৎসা ও শিশুসেবার ব্যবস্থা: শ্রমিকদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের শিক্ষা ও দিবাযত্নের সুযোগ বাড়াতে হবে। এতে তাঁদের পারিবারিক ব্যয় ও জীবনযাত্রার চাপ কমবে।
শ্রমিকের আন্দোলনের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সহিংসতা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করাও সমাধান হতে পারে না। কোনো অপরাধ ঘটলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে অপরাধের দায় নিরপরাধ শ্রমিকের ওপর চাপানো যাবে না।
শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, দেশ বাঁচবে
পোশাকশিল্প শুধু কারখানার মালিক বা রপ্তানিকারকদের সম্পদ নয়; এটি লাখো শ্রমিকের জীবিকা এবং জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁদের শ্রমের অধিকার।
শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রেখেই শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের পথ খুঁজতে হবে। মালিক, শ্রমিক, সরকার ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্বশীল সমঝোতা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
যে শ্রমিকের ঘামে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ে, সেই শ্রমিকের ঘরে যদি ন্যূনতম স্বস্তি না থাকে, তাহলে শিল্পের সাফল্য কতটা অর্থবহ? শ্রমিকের শ্রমে দেশ সমৃদ্ধ হবে, অথচ শ্রমিকের পরিবার দারিদ্র্যের চাপে থাকবে—এই বৈপরীত্য আর কত দিন চলবে? শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করাই হোক শিল্পের স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম শর্ত।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৩ নভেম্বর, ২০২৬