তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
২০৪২ সালের মধ্যে নিউহামে ৫৪ হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা, ৫০ শতাংশ হবে সাশ্রয়ী আবাসন
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৩ নভেম্বর:
লন্ডনের পূর্বাঞ্চলীয় বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা নিউহামে আগামী ২০৪২ সালের মধ্যে প্রায় ৫৪ হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে নিউহাম কাউন্সিল। একই সঙ্গে নতুন নির্মিত বাড়ির ৫০ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসন হিসেবে গড়ে তোলার কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবাসনসংকট, বাড়িভাড়ার ঊর্ধ্বগতি এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ মোকাবিলায় এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ২ নভেম্বর সোমবার কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ সভায় (Full Council) নতুন Our Newham Local Plan আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। এর মাধ্যমে ২০৪২ সাল পর্যন্ত নিউহামের আবাসন, কর্মসংস্থান, শিল্প-বাণিজ্য, অবকাঠামো ও নগর উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কার্যকর হলো।

নিউহামের মেয়র ফরহাদ হোসেন এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য এমন একটি নিউহাম গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক মানুষ এগিয়ে যাওয়ার সমান সুযোগ পাবেন এবং কোনো জনগোষ্ঠী উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকবে না।
মেয়র বলেন, নিউহামে আরও প্রকৃত সাশ্রয়ী মূল্যের বাড়ি এবং সামাজিক ভাড়ার আবাসন প্রয়োজন। পাশাপাশি উন্নত কর্মসংস্থান, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ, প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক এলাকা, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ এবং পরিবারের উপযোগী বাড়ি নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন বাড়ির ৫০ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসন
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন নির্মিত বাড়ির ৫০ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসন হিসেবে গড়ে তোলার কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রা।
বিশেষ করে সামাজিক ভাড়ার (Social Rent) বাড়ি নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ নিউহামে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বহু পরিবারের জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি কেনা কিংবা বেসরকারি বাড়িভাড়া বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিকল্পনায় সামাজিক ভাড়ার বাড়ির মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ তিন বা তার বেশি শয়নকক্ষবিশিষ্ট পারিবারিক বাড়ি করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এতে বড় পরিবার এবং সন্তানদের নিয়ে বসবাসকারী পরিবারগুলো উপকৃত হতে পারে।
উল্লেখ্য, সাশ্রয়ী আবাসন বলতে শুধু সামাজিক ভাড়ার বাড়ি বোঝায় না। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কম ভাড়ার আবাসন ও অন্যান্য সাশ্রয়ী মালিকানার ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
বাড়ির পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ
নিউহামের নতুন পরিকল্পনায় শুধু আবাসন নির্মাণ নয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ১৮ হাজার বর্গমিটার শিল্পকারখানা ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট জায়গা এবং কমপক্ষে ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গমিটার অফিস স্পেসের ব্যবস্থা রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
বিশেষ করে স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪৫টি এলাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা
নতুন Local Plan-এ নিউহামের বিভিন্ন এলাকার জন্য পৃথক উন্নয়ন নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য মোট ৪৫টি নির্দিষ্ট স্থান বা উন্নয়ন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব এলাকায় কোথায় আবাসন নির্মাণ হবে, কোথায় শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং কোথায় জনসাধারণের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, তা পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।
নতুন আবাসন প্রকল্পের পাশাপাশি সড়ক, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধার প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
কাউন্সিলের উদ্দেশ্য হলো, শুধু বহুতল ভবন নির্মাণ করে জনসংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলা।
বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বড় চ্যালেঞ্জ
মেয়র ফরহাদ হোসেন স্বীকার করেছেন, নিউহামের বাসিন্দারা বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। বাড়িভাড়া বেশি, পারিবারিক ব্যয় বেড়েছে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি খরচের মুখোমুখি হচ্ছে।
তাঁর মতে, শুধু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই হবে না, বাস্তবে তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও থাকতে হবে।
নতুন পরিকল্পনার সঙ্গে কাউন্সিলের 'অপরচুনিটি নিউহাম' (Opportunity Newham) কর্মসূচির সমন্বয় করা হবে। এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, আবাসন নির্মাতা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিউহামে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মেয়র বলেন, নিউহামের উন্নয়নের সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। আরও সাশ্রয়ী বাড়ি, বসবাসের কাছাকাছি ভালো কর্মসংস্থান এবং তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
নিউহামের বাঙালি পরিবারগুলোর জন্য কী অর্থ বহন করে?
নিউহামে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ও ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের অনেকেই বাড়িভাড়া, অতিরিক্ত জনাকীর্ণ বাসস্থান এবং পর্যাপ্ত শয়নকক্ষের অভাবে সমস্যায় রয়েছেন।
বিশেষ করে সন্তানদের নিয়ে বসবাসকারী বড় পরিবারগুলোর জন্য উপযুক্ত আবাসন পাওয়া কঠিন। কাউন্সিলের নতুন পরিকল্পনায় তিন বা তার বেশি শয়নকক্ষবিশিষ্ট সামাজিক ভাড়ার বাড়ির ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় এসব পরিবারের জন্য ভবিষ্যতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ৫৪ হাজার বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্য ঘোষণা করা মানেই প্রত্যেক আবেদনকারী দ্রুত বাড়ি পাবেন, এমন নয়। একইভাবে ৫০ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সব বাড়ি সামাজিক ভাড়ায় পাওয়া যাবে না।
প্রকল্প বাস্তবায়ন, জমির প্রাপ্যতা, বিনিয়োগ, নির্মাণব্যয় এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামো নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করবে পরিকল্পনার বাস্তব অগ্রগতি।
নতুন Local Plan প্রণয়নের আগে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি এখন নিউহামের আগামী দিনের উন্নয়ন ও আবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
বাস্তবতা হলো, নিউহামে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ৫৪ হাজার বাড়ি নির্মাণ নয়; বরং যাদের সবচেয়ে বেশি বাড়ি প্রয়োজন, তাদের কাছে যেন সত্যিকার অর্থে সাশ্রয়ী আবাসন পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করা।