ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

দেশে পোশাক শ্রমিকের ঘামে বিলিয়ন ডলারের শিল্প, অথচ নিজের সংসার চলে না কেন?

দেশে পোশাক শ্রমিকের ঘামে বিলিয়ন ডলারের শিল্প, অথচ নিজের সংসার চলে না কেন?

ভয়েস অব পিপল | বিশেষ ফিচার

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সাফল্যের গল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের পরিচিতি বেড়েছে, রপ্তানি আয় বেড়েছে, গড়ে উঠেছে অসংখ্য কারখানা। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে এই শিল্প। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে—যাঁদের শ্রমে এত বড় শিল্প দাঁড়িয়ে আছে, তাঁদের নিজেদের সংসার চালানোর সামর্থ্য কেন এত সীমিত?

একজন পোশাকশ্রমিক মাসের পর মাস কাজ করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটান কারখানার নির্ধারিত কর্মঘণ্টায়। কখনো অতিরিক্ত সময় কাজ করেও মাস শেষে হাতে যে টাকা পান, তা দিয়ে চার সদস্যের পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও যাতায়াতের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। মাসের মাঝামাঝি বেতন শেষ হয়ে গেলে শুরু হয় ধারদেনা। কারও সংসারে খাবারের পরিমাণ কমে, কারও সন্তানের পড়াশোনার খরচ বন্ধ হয়, আবার কেউ চিকিৎসা না করিয়েই অসুস্থতা নিয়ে কাজে যান।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন পরিবারের সংকট নয়; বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের একটি বড় অংশের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। এই দাবি শুনে কেউ কেউ একে অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ৩০ হাজার টাকা কি সত্যিই অযৌক্তিক?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের পরিবর্তে অর্থনীতির বাস্তব হিসাব দেখতে হবে।

বেতন বাড়লেও কেন কমছে ক্রয়ক্ষমতা

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এরপর প্রায় তিন বছর পার হয়েছে। এই সময়ে খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস, পরিবহন ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শ্রমিকের আয় বাড়েনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ আগের তুলনায় একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে মানুষকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

এর অর্থ, কাগজে বেতন কিছুটা বাড়লেও বাস্তবে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। একসময় যে টাকা দিয়ে একটি পরিবার মাসের প্রয়োজনীয় বাজার করতে পারত, এখন সেই টাকায় অর্ধেক মাসের বাজারও করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ধরা যাক, চার সদস্যের একটি পরিবারে একজনই উপার্জন করেন। খাবার, বাসাভাড়া, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো অপরিহার্য খরচ মেটাতে মাসে অন্তত ১৮ থেকে ২১ হাজার টাকা প্রয়োজন। অথচ ওভারটাইমসহ তাঁর আয় যদি ১৫-১৬ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ঘাটতি পূরণ হবে কোথা থেকে? বাস্তবে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হয় ঋণ করে, খাবারের ব্যয় কমিয়ে কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—দারিদ্র্য শুধু আয় কম হওয়ার নাম নয়; প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে না পারাও দারিদ্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

৩০ হাজার টাকার দাবির পেছনে কী যুক্তি?

শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিকে বুঝতে হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লিভিং ওয়েজ’ বা জীবনধারণযোগ্য মজুরির ধারণাটি জানা প্রয়োজন।

ন্যূনতম মজুরি এবং জীবনধারণযোগ্য মজুরি এক বিষয় নয়। ন্যূনতম মজুরি হলো আইন বা সরকারি সিদ্ধান্তে নির্ধারিত সর্বনিম্ন পারিশ্রমিক। অন্যদিকে জীবনধারণযোগ্য মজুরি হলো এমন আয়, যা দিয়ে একজন শ্রমিক ও তাঁর পরিবার খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবেন এবং সামান্য হলেও আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন।

গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের ২০২৫ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য জীবনধারণযোগ্য মজুরি মাসে প্রায় ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। অর্থাৎ শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবিটি কেবল আন্দোলনের মাঠে তৈরি হওয়া কোনো সংখ্যা নয়; আন্তর্জাতিক গবেষণায় ব্যবহৃত জীবনধারণযোগ্য মজুরির হিসাবের সঙ্গেও এর উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবারের একজন সদস্যের আয় দিয়ে চারজনের সংসার চালানো কতটা বাস্তবসম্মত। অনেক শ্রমিকের স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যও উপার্জনের চেষ্টা করেন। তারপরও নিম্ন আয়ের কারণে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না। সন্তানদের পুষ্টি, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণবিষয়ক কনভেনশন ১৩১-এ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের প্রয়োজন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু কারখানার উৎপাদন খরচ নয়, শ্রমিকের মানবিক প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমিকের মজুরি বাড়লে কারখানার ক্ষতি হবে?

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রশ্ন উঠলেই মালিকপক্ষের একটি পরিচিত যুক্তি সামনে আসে—উৎপাদন খরচ বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাবে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো টিকে থাকতে পারবে না। ক্রেতারা কম দামের জন্য অন্য দেশে চলে যেতে পারেন। এতে কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

এই উদ্বেগ পুরোপুরি অমূলক নয়। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে কম মূল্য পাওয়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

কিন্তু শ্রমিকের মজুরি কম রাখলেই যে শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে, তারও নিশ্চয়তা নেই।

অর্থনীতিতে ‘এফিশিয়েন্সি ওয়েজ’ বা দক্ষতাভিত্তিক মজুরি তত্ত্ব রয়েছে। এর মূল ধারণা হলো, শ্রমিককে তুলনামূলক ভালো বেতন দিলে তাঁর কাজের আগ্রহ ও উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতা কমে। ফলে নতুন শ্রমিক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যয়ও কমে আসে।

অর্থনীতিবিদ ডেভিড কার্ড ও অ্যালান ক্রুগারের গবেষণায় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাঁদের গবেষণার ফলাফল দেখিয়েছে, মজুরি বৃদ্ধি মানেই সব পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, যেকোনো পরিমাণ মজুরি বৃদ্ধি সব কারখানার জন্য একইভাবে সহনীয় হবে। প্রয়োজন শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক ক্রয়মূল্য বিবেচনায় একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা।

দায় কি শুধু কারখানার মালিকের?

পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এককভাবে মালিকপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে সরকার, কারখানার মালিক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা—তিন পক্ষেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

প্রথমত, পোশাকের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের দায়িত্ব রয়েছে। তাঁরা বাংলাদেশের কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ পোশাক সংগ্রহ করেন। কিন্তু উৎপাদন খরচের ন্যায্য হিসাব এবং শ্রমিকের মজুরির বিষয়টি ক্রয়মূল্যে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হলে সেই চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের ওপরই পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পোশাকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, মালিকপক্ষকে উৎপাদন ব্যয় ও মুনাফার হিসাব স্বচ্ছ করতে হবে। শিল্পের প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকের জীবনেও পৌঁছাতে হবে। শুধু রপ্তানি আয় বাড়লেই শিল্পের সাফল্য পূর্ণতা পায় না; সেই আয়ের সঙ্গে শ্রমিকের জীবনমানের উন্নতিও জরুরি।

তৃতীয়ত, সরকারের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত। মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য, চিকিৎসাসেবা, গণপরিবহন ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দরিদ্র শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধরনের সহায়তা কেবল সামাজিক কল্যাণ নয়; এটি দেশের উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার বিনিয়োগ।

রপ্তানি আয়ের সাফল্য, শ্রমিকের জীবনে তার প্রতিফলন কোথায়?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে এই একটি শিল্প থেকে।

চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে লাখ লাখ শ্রমিকের পরিশ্রম, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

কিন্তু এত বড় একটি শিল্পের শ্রমিকেরা যদি মাস শেষে ঋণগ্রস্ত হন, তাঁদের সন্তানদের পুষ্টি ও শিক্ষার ব্যয় মেটাতে না পারেন, তাহলে শিল্পের উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। শুধু রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা শিল্পের সম্প্রসারণ দিয়ে উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। শ্রমিকের জীবনমানও সেই উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি।

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর Poverty and Famines গ্রন্থে দেখিয়েছেন, দুর্ভিক্ষের পেছনে শুধু খাদ্যের অভাব নয়, মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলাও বড় কারণ হতে পারে। বাজারে খাবার থাকলেও মানুষের হাতে তা কেনার মতো অর্থ না থাকলে ক্ষুধা দূর হয় না।

বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের বাস্তবতার সঙ্গেও এই ধারণার মিল রয়েছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল কিংবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আছে। কিন্তু শ্রমিকের আয় দিয়ে সেগুলো কেনার সামর্থ্য না থাকলে সেই প্রাচুর্য তাঁর কোনো কাজে আসে না।

সংঘর্ষ নয়, প্রয়োজন কার্যকর সমাধান

শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে সহিংসতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। একইভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে উপেক্ষা করে শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সমস্যাটিকে সীমাবদ্ধ রাখাও সমাধান নয়।

কারখানা বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিকেরা। কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকলেও তাঁদের পরিবারের খাবার, বাড়িভাড়া কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজন বন্ধ থাকে না। আবার উৎপাদন ব্যাহত হলে মালিকপক্ষ ও দেশের রপ্তানি খাতও ক্ষতির মুখে পড়ে।

তাই শ্রমিক অসন্তোষের পেছনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বোর্ড গঠন করাই যথেষ্ট নয়; সেখানে শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, মূল্যস্ফীতি এবং শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।

মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি নিয়মিত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয়ের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। নইলে কয়েক বছর পর আবার একই সংকট তৈরি হবে। আজ যে মজুরি দিয়ে কোনোরকমে সংসার চলে, মূল্যস্ফীতির চাপে আগামী বছর সেটিও অপ্রতুল হয়ে পড়বে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নির্ধারিত সময়ে বেতন, ওভারটাইমের যথাযথ পারিশ্রমিক এবং চাকরির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে

একটি পোশাক কারখানার প্রকৃত শক্তি শুধু তার যন্ত্রপাতি, ভবন কিংবা বিদেশি ক্রেতা নয়। এর সবচেয়ে বড় শক্তি সেই মানুষগুলো, যাঁদের শ্রমে প্রতিদিন হাজার হাজার পোশাক তৈরি হয়। তাঁদের শ্রমের বিনিময়েই বাংলাদেশের নাম পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে।

অতএব শ্রমিকের ন্যায্য মজুরিকে শিল্পের ওপর অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁর অধিকার এবং উৎপাদনব্যবস্থার নৈতিক দায়িত্ব।

একজন শ্রমিক সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে যদি সন্তানের মুখে পর্যাপ্ত খাবার তুলে দিতে না পারেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতে না পারেন, কিংবা মাসের শেষ সপ্তাহে ধারদেনা করে বেঁচে থাকতে হয়, তাহলে সেই শ্রমের বিনিময়কে ন্যায্য বলা যায় না।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামনে এখন দুটি পথ—কম মজুরির ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া, অথবা দক্ষতা, প্রযুক্তি, ন্যায্য মূল্য ও মানবিক শ্রমনীতির সমন্বয়ে টেকসই শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলা।

দ্বিতীয় পথটি কঠিন হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটিই অধিক কার্যকর।

মনে রাখতে হবে, পোশাকশিল্পের সাফল্য শুধু বিদেশে কত ডলারের পণ্য বিক্রি হলো, সেই হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হবে, সেই শিল্পে কাজ করা একজন শ্রমিক তাঁর পরিবার নিয়ে কতটা সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারছেন।

যে শ্রমিকের ঘামে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, তাঁর নিজের সংসার যদি অনিশ্চয়তায় ডুবে থাকে, তাহলে সেই অর্থনৈতিক সাফল্যের পূর্ণতা কোথায়?