তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
লন্ডনের ১০ ধর্মীয় স্থাপনায় লুকিয়ে আছে অভিবাসীদের শত বছরের ইতিহাস
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১ নভেম্বর :
লন্ডনকে বিশ্বের অন্যতম বহুজাতিক শহর বলা হয়। এখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ শুধু বসতি গড়েননি, নিজেদের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিও ধরে রেখেছেন। শহরটির বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা পুরোনো গির্জা, সিনাগগ ও মসজিদগুলোর দিকে তাকালে অভিবাসনের কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস সামনে আসে।
লন্ডনের অন্তত ১০টি ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শরণার্থী, নাবিক, ব্যবসায়ী ও অভিবাসীদের জীবনকাহিনি। কোনোটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের উপাসনার জন্য, কোনোটি বিদেশি নাবিকদের আশ্রয় ও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে। আবার কোনো কোনো ভবন সময়ের সঙ্গে এক ধর্মের উপাসনালয় থেকে অন্য ধর্মের উপাসনালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।
ডাচ চার্চ
লন্ডনের অস্টিন ফ্রায়ার্স এলাকায় অবস্থিত ডাচ চার্চের ইতিহাস শুরু ১৫৫০ সালে। ইউরোপে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ইংল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া ডাচ ও ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্টদের উপাসনার জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বোমা হামলায় মূল ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের প্রাচীনতম ডাচ ভাষাভিত্তিক প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জাগুলোর একটি।
ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ
সোহো স্কয়ারের এই গির্জাটিও প্রতিষ্ঠিত হয় ১৫৫০ সালে। ফ্রান্সে ধর্মীয় নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা হুগেনো সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে উপাসনা করতেন। একসময় লন্ডনে হুগেনোদের ২৩টি গির্জা থাকলেও বর্তমানে সোহো স্কয়ারের এই প্রতিষ্ঠানটি শহরের একমাত্র অবশিষ্ট হুগেনো গির্জা। বর্তমান ভবনটি নির্মিত হয় ১৮৯৩ সালে।
ব্রিটেনের প্রাচীনতম সিনাগগ
লন্ডনের বেভিস মার্কস সিনাগগ ব্রিটেনের সবচেয়ে পুরোনো ইহুদি উপাসনালয়। ১৭০১ সালে স্পেন ও পর্তুগাল থেকে আসা সেফারদি ইহুদিদের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এখানে নিয়মিত উপাসনা চলছে। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলির জন্মের সময় ১৮০৪ সালে এই সিনাগগে তাঁর নাম নিবন্ধিত হয়েছিল।
ব্রিক লেন জামি মসজিদ
লন্ডনের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ব্রিক লেন জামি মসজিদ। তবে এর অতীত ইতিহাস আরও বিস্ময়কর। একই ভবন একসময় ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্টদের গির্জা, পরে মেথডিস্ট উপাসনালয় এবং এরপর ইহুদিদের সিনাগগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
১৭৪৩ সালে ফরাসি হুগেনোদের জন্য ভবনটি নির্মিত হয়। ১৮৯১ সালে এটি স্পিটালফিল্ডস গ্রেট সিনাগগে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৬ সালে ভবনটি মসজিদ হিসেবে চালু হয়। বর্তমানে এটি লন্ডনের বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র।
ইতালীয় চার্চ
ক্লারকেনওয়েলের ইতালীয় চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৩ সালে। একসময় এলাকাটি লিটল ইতালি নামে পরিচিত ছিল। ইতালি থেকে আসা অভিবাসীদের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণে গির্জাটি নির্মাণ করা হয়। রোমের প্রাচীন ব্যাসিলিকার স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব রয়েছে এর নির্মাণে। এটি ব্রিটেনে ইতালীয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
নোত্র দাম দ্য ফ্রঁস
লেস্টার স্কয়ারের কাছে অবস্থিত এই ফরাসি গির্জাটির ভবন একসময় চিত্র প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহৃত হতো। ১৮৬৫ সালে ফরাসি ধর্মযাজক চার্লস ফোর লন্ডনের ফরাসি সম্প্রদায়ের জন্য এটিকে গির্জায় রূপান্তর করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ফরাসি শিল্পীদের সহযোগিতায় ভবনটির অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য পুনর্নির্মাণ করা হয়।
ফিনিশ চার্চ
রোদারহাইথ এলাকায় অবস্থিত ফিনিশ চার্চ প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল বিদেশে কর্মরত ফিনিশ নাবিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজন। ১৮৮২ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৫৮ সাল থেকে বর্তমান ভবনটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি ফিনিশ ভাষায় বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম, ক্যাফে ও সাংস্কৃতিক আয়োজন পরিচালিত হয়।
নরওয়েজীয় চার্চ
লন্ডনের ডকল্যান্ড এলাকায় নরওয়েজীয় নাবিকদের জন্য ১৮৬৮ সালে ধর্মীয় মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে রোদারহাইথে বর্তমান গির্জাটি নির্মিত হয়। ১৯২৬ সালে নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্স ওলাভ এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি নরওয়ে দখল করলে নির্বাসিত নরওয়েজীয় রাজপরিবার ও সরকার এই গির্জার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এটি প্রো-ক্যাথেড্রালের মর্যাদা পায়।
ডেনিশ চার্চ
লন্ডনে ডেনিশ সম্প্রদায়ের প্রথম গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৬৯৬ সালে। বর্তমানে রিজেন্টস পার্কের কাছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো সেন্ট ক্যাথারিন গির্জা ডেনিশ সম্প্রদায়ের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৫২ সালে ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডেরিক ও রানি ইনগ্রিডের উপস্থিতিতে এটি ডেনিশ চার্চ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
ইউক্রেনীয় ক্যাথলিক ক্যাথেড্রাল
ডিউক স্ট্রিটে অবস্থিত ইউক্রেনীয় ক্যাথলিক ক্যাথেড্রাল অব দ্য হলি ফ্যামিলি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ইউক্রেনীয়দের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র। ১৮৯১ সালে নির্মিত ভবনটি ১৯৬৭ সালে ইউক্রেনীয় ক্যাথলিক চার্চের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০২২ সালে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা বহু শরণার্থীর জন্য এটি সহায়তা ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
লন্ডনের এসব ধর্মীয় স্থাপনা কেবল ইট-পাথরের পুরোনো ভবন নয়। এগুলোর প্রতিটিতে রয়েছে মানুষের দেশত্যাগ, ধর্মীয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, নতুন সমাজে জায়গা করে নেওয়া এবং নিজস্ব সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার ইতিহাস।
একটি ভবন কখনো গির্জা, কখনো সিনাগগ, আবার কখনো মসজিদ হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে উপাসনালয়ের পরিচয় বদলালেও মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়োজন বদলায়নি। বহুজাতিক লন্ডনের ইতিহাস বুঝতে হলে তাই এসব ধর্মীয় স্থাপনার ইতিহাসও জানা জরুরি।