‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

জীবনযাত্রার ব্যয় ও ট্রাম্পের নীতিতে ক্ষুব্ধ মার্কিন ভোটার, মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কার আশঙ্কা রিপাবলিকানদের

জীবনযাত্রার ব্যয় ও ট্রাম্পের নীতিতে ক্ষুব্ধ মার্কিন ভোটার, মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কার আশঙ্কা রিপাবলিকানদের

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ৩ নভেম্বর:

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এসব কারণে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে (Midterm Elections) ভোটারদের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির প্রতি সমর্থনে চাপ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে ভোট দেওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষের ওপর পরিচালিত এক জাতীয় জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭৯ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ভোটারের ওপর পরিচালিত একটি প্রাথমিক জাতীয় জরিপে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

জরিপে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে খারাপ বা সন্তোষজনক নয় বলে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁদের কাছে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

ট্রাম্পের নীতির ওপর আস্থা কমছে

নির্বাচনী জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধি পরিষদে (House of Representatives) ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে, প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জন মনে করেন, ট্রাম্প দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কংগ্রেসের কার্যক্রম নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের ধারণা, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কংগ্রেস যথেষ্ট ভূমিকা পালন করছে না।

এদিকে অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিই ভোটারদের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। অর্থাৎ শুধু ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপরও মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

খাদ্য ও জ্বালানির দামই বড় মাথাব্যথা

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের অন্যতম বড় অংশ খাদ্য ও পরিবহন খাতে। ফলে পেট্রল, ডিজেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পারিবারিক বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে।

ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জরিপে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক ভোটারের অসন্তোষ থেকে বোঝা যাচ্ছে, সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক আরোপের নীতি এবং ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতাও উল্লেখযোগ্য।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা বাড়ছে

জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সিনেটেও রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে।

এমন পরিস্থিতি ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে তাঁর আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে কংগ্রেসে তদন্ত ও জবাবদিহির চাপ বাড়তে পারে।

তবে জরিপের প্রাথমিক ফলাফলকে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। আসনভিত্তিক ভোটের ফল এবং রাজ্যগুলোর চূড়ান্ত গণনা নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে।

অর্থনীতিই ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ে অসন্তোষ তাঁর সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু বিরোধী ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যেই নয়, রিপাবলিকান ভোটারদের একাংশের মধ্যেও অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, ভোটারদের এই অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা পরিবর্তন করে এবং ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে নিয়ে যায়।