তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
নিরাপত্তাহীনতার নানা রূপ, ৯ মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ নভেম্বর:
নয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান বাংলাদেশের নাগরিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচনী সহিংসতা, নারী ও শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন, গণপিটুনি, কারাগারে মৃত্যু এবং সীমান্তে প্রাণহানির মতো ঘটনা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ২ হাজার ৯০১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০৯ জন, আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৭৯২ জন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬১৭ নারী ও শিশু। তাঁদের মধ্যে ৩৮৮ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এ ছাড়া গণপিটুনিতে ৭৪ জন এবং কারাগারে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ও নির্যাতনে নিহত হয়েছেন ১১ বাংলাদেশি।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, বিচারব্যবস্থা এবং কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, নয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নির্বাচনী সহিংসতার ১ হাজার ৩৮১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৬৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে গণপিটুনিতে নিহত ৭৪ জনের মধ্যে মে মাসে সর্বোচ্চ ১৩ জন এবং জুন মাসে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
ধর্ষণের শিকার ৩৮৮ মেয়েশিশু
নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার ৬১৭ জনের মধ্যে ৩৮৮ জন মেয়েশিশু এবং ২২৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। বাকি দুজনের বয়স নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতনের ঘটনায় নয় মাসে ২২ নারীর মৃত্যু হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৭ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন সাতজন। এ ছাড়া নারীদের উত্ত্যক্ত করার ৩৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।

সাংবাদিকদের ওপর ১৬৯ হামলা ও হয়রানির ঘটনা
সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ১৬৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে অধিকার।
এর মধ্যে ৬৫টি ঘটনায় সাংবাদিকেরা আহত হয়েছেন, ২২ জন লাঞ্ছিত এবং ২৫ জন হুমকির শিকার হয়েছেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা এবং ২১টি অপহরণের ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া পাঁচটি হামলা, একজন সাংবাদিকের গ্রেপ্তার এবং একজনকে নির্যাতনের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে দেশে গুমের শিকার হয়েছেন দুজন।
কারাগারে ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বন্দী
দেশের কারাগারগুলোর পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দী রাখার সরকারি ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জন। অথচ গত ১৩ সেপ্টেম্বর এসব কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ১০২। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি, প্রায় আড়াই গুণ।
নয় মাসে কারাগারের ভেতরে ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। কারাগারে নির্যাতন, দুর্নীতি এবং অসুস্থ বন্দীদের হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখার অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে একই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১০ জন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন নির্যাতনে, দুজন পিটুনিতে এবং দুজন গুলিতে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০০ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত ১১ বাংলাদেশি
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মানবাধিকার পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিএসএফের হাতে ১১ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১১ জন।
এ সময়ে বাংলাদেশে ৫৬ জনকে পুশ ইন করার ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে বিএসএফের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ৭৮টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি।
গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে আপত্তি
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে অধিকার। সংগঠনটির মতে, আইনের ১৪(৩) ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত অন্য কোনো বাহিনী কিংবা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের কাছে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া আইনের ২১ ধারায় আদালতে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে। অধিকারের আশঙ্কা, এ ধরনের শাস্তির বিধান গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কমিশন নিজ উদ্যোগে তদন্ত করতে পারবে না। অধিকার মনে করে, এ বিধান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা সীমিত করতে পারে। আইনটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্যারিস নীতিমালার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
র্যাবের পরিবর্তে নতুন বাহিনী, পুরোনো কাঠামো বহাল থাকার আশঙ্কা
র্যাব বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতির পর নতুন বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অধিকার। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে র্যাবের জনবল, সম্পদ, ক্ষমতা ও চলমান মামলাসহ বিভিন্ন বিষয় নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
অধিকারের মতে, এ প্রক্রিয়ায় বাহিনীর নাম ও কাঠামো পরিবর্তিত হলেও র্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হওয়ায় তা বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে পুলিশে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
সব মিলিয়ে অধিকারের ৯ মাসের প্রতিবেদন রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে শুরু করে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কারাগারের পরিস্থিতি এবং সীমান্তে প্রাণহানির একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছে। এসব পরিসংখ্যান দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।