তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

দেশে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়, মানবিকে ফেল ৫৮ শতাংশ

দেশে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়, মানবিকে ফেল ৫৮ শতাংশ

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ নভেম্বর:

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবার দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। মানবিক বিভাগে পাস করেছে মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বেড়েছে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশীয় পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে কমে হয়েছে ৪০ হাজার ৮৪। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।

ফলাফলের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২। অর্থাৎ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।

বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। এ বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিলেও এ বিভাগেই অকৃতকার্যের হার বেশি।

ফলাফলে অঞ্চলভেদেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে বরিশাল বোর্ডে সর্বনিম্ন ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ। ঢাকা মহানগরীর শিক্ষার্থীদের পাসের হার ৭৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ হলেও ঢাকা বোর্ডের ১৩ জেলার মধ্যে সাতটিতে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে।

অন্যদিকে নটর ডেম কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফল তুলনামূলক ভালো হয়েছে। দেশের ১২টি ক্যাডেট কলেজেও শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। এসব ফলাফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার সুযোগের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যকে সামনে এনেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান ফল খারাপ হওয়ার পেছনে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদ শূন্য থাকা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট, পাঠদানে অনিয়ম এবং শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও ৪০ শতাংশের নিচে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবারের ফলকে অসন্তোষজনক উল্লেখ করে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি ও শিখনপদ্ধতির দুর্বলতা ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে দ্রুত পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। সম্ভব হলে এক মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার জন্য শুধু তাদের প্রস্তুতিকে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যাবে। শিক্ষক সংকট, দুর্বল পাঠদান, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি—সবকিছুই পর্যালোচনার প্রয়োজন। একই পাঠ্যক্রমে পরীক্ষা দিয়ে প্রতিষ্ঠান ও অঞ্চলভেদে এত বড় ব্যবধান কেন তৈরি হচ্ছে, তার উত্তর খুঁজে বের করাই এখন শিক্ষা প্রশাসনের বড় দায়িত্ব।