বাংলাদেশ সংবাদ

জন্মের পরই মিলবে ‘এক-আইডি’, এক কার্ডেই স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ সরকারি সেবা

জন্মের পরই মিলবে ‘এক-আইডি’, এক কার্ডেই স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ সরকারি সেবা
“প্রতীকী ছবি”

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৪ সেপ্টেম্বর:

দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন একক পরিচয়পত্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জন্মের পরপরই শিশুকে দেওয়া হবে এই পরিচয়পত্র। পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি কিংবা অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে আলাদা আলাদা পরিচয়পত্র বা একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে।

নতুন এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (ডি-স্টার)’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। অনুমোদনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

বর্তমানে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ নাগরিকদের বিভিন্ন পরিচয় ও সেবার জন্য আলাদা তথ্যব্যবস্থা রয়েছে। নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য এসব ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনা।

খরচ হবে পাঁচ বছরে ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি

প্রস্তাবিত প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের বড় অংশ ব্যয় হবে পরিচয়পত্র তৈরি, মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং নাগরিকদের কাছে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার কাজে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির লক্ষ্য থাকলেও উৎপাদন করা হবে ২০ কোটি কার্ড। প্রতিটি পলিকার্বনেট চিপ কার্ড তৈরির খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে বিতরণ ও সরবরাহ বাবদ আরও ১২৩ টাকা যোগ হবে। অর্থাৎ একটি কার্ডের উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩৬৯ টাকা

পুরোনো কার্ডের জায়গা নেবে ১টি কার্ড

সরকারের পরিকল্পনায় নতুন পরিচয়পত্র চালু হলে ধীরে ধীরে এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি কার্ডের আলাদা কার্যকারিতা কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এসব কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া সেবাগুলো এক-আইডির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে ঠিক কোন কোন তথ্য নতুন কার্ডে থাকবে এবং বিদ্যমান কার্ডগুলো কীভাবে একীভূত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টার দেওয়া ধারণা অনুযায়ী, ব্যবস্থাটির মূল দর্শন হচ্ছে—‘একজন নাগরিক, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট’। অর্থাৎ একই পরিচয়ের মাধ্যমে নাগরিক পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

জন্ম থেকেই নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয়

বর্তমান ব্যবস্থায় জন্মের পর শিশুর জন্মনিবন্ধন হয়, আর ১৮ বছর বয়সে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এক-আইডি চালু হলে এই ব্যবধান থাকবে না। জন্মের পরই একজন নাগরিকের স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সরকারের যুক্তি, এর ফলে একজন নাগরিককে বিভিন্ন দপ্তরে একই তথ্য বারবার দিতে হবে না। একই সঙ্গে একাধিক জন্মনিবন্ধন বা পরিচয় তৈরির মতো অনিয়ম ঠেকানোও সহজ হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন করে বিশাল ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়ার আগে বিদ্যমান এনআইডি ব্যবস্থাকেই আরও কার্যকর করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা দরকার। এনআইডির সঙ্গে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএনের তথ্যভান্ডারের কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে একই ধরনের সুবিধা কম ব্যয়েও পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

এক-আইডি প্রকল্প তাই শুধু নতুন একটি কার্ড তৈরির উদ্যোগ নয়; এটি দেশের নাগরিক পরিচয় ও সরকারি সেবা ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল কাঠামোয় নেওয়ার বড় পরিকল্পনা। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বিভিন্ন সরকারি ডেটাবেসের সমন্বয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতার ওপর।