বাংলাদেশ সংবাদ
গ্রিডের অর্ধেক খরচে শিল্পকারখানায় ৬৬৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৪ সেপ্টেম্বর:
দেশের ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে এখন উৎপাদন হচ্ছে ৬৬৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় অর্ধেক খরচে এই বিদ্যুৎ পাওয়ায় শিল্প মালিকদের ব্যয় কমছে, পাশাপাশি সংকটের সময়ে জাতীয় গ্রিডের ওপরও চাপ কিছুটা কমছে।
শিল্প খাতে গত দুই-তিন বছরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ইতোমধ্যে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা স্থাপন হয়েছে। এর মধ্যে ২৩৯টি বড় কারখানার হিসাবেই সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর সুফল সরাসরি দেখা যাচ্ছে শিল্পের বিদ্যুৎ ব্যয়ে। ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলারের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে যেখানে প্রায় ১১ টাকা ৫৬ পয়সা খরচ হয়, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ৫ টাকা।
এই ব্যবধানের কারণে তাদের একটি শিল্পগোষ্ঠীর দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। মাসের হিসাবে সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
ওমেরা সোলারের অধীনে বর্তমানে ১০০টির বেশি শিল্পকারখানার ছাদে প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। আগামী ছয় মাসে এই সক্ষমতা ১৮০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে সৌরবিদ্যুৎ এখন শুধু পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিকল্প নয়; উৎপাদন খরচ কমানোর একটি বাস্তব ব্যবসায়িক কৌশলও হয়ে উঠেছে। কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে দিনের বেলায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে কারখানার উৎপাদন চালু রাখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট বা লোডশেডিংয়ের সময়ে এতে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমছে।
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে নেট মিটারিংও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারখানার নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে সেই বিদ্যুতের হিসাব বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ থাকায় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে এ খাতে বড় বিনিয়োগ শুরু করেছে। প্রাণ-আরএফএলের ২০টি কারখানা থেকে বর্তমানে প্রায় ৩৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ তা ৮০ মেগাওয়াটে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী দুই বছরে ১২০ মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। রাইজিং গ্রুপের চারটি কারখানায় বর্তমানে ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এসব কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ ছাদে ইতোমধ্যে সৌরপ্যানেল বসানো হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদা—সব মিলিয়ে সৌরবিদ্যুতের দিকে শিল্প খাতের ঝোঁক বাড়ছে।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে গ্রিন এনার্জির ব্যবহার এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতে কারখানার ছাদে সৌরপ্যানেল বসানো শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয় থাকবে না, রপ্তানি বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে করা বিনিয়োগ সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুযোগ থাকায় নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্যও এই খাত ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
তবে সৌরবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে দিনের আলো। সন্ধ্যা ও পিক আওয়ারে এই বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। এ কারণে শিল্পকারখানায় ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ যুক্ত করা গেলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে শিল্পের ছাদ তাই এখন আর শুধু অব্যবহৃত জায়গা নয়। উৎপাদন খরচ কমানো থেকে শুরু করে গ্রিডের ওপর চাপ কমানো—দুই দিক থেকেই এটি দেশের শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। ৬৬৭ মেগাওয়াটের বর্তমান সক্ষমতা সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় প্রমাণ।