দ্য টেলিগ্রাফে বাংলাদেশের ডেঙ্গু-হাম সংকট নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

ডেঙ্গুর দাপটে আরও জটিল হচ্ছে হাম পরিস্থিতি, চাপে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

ডেঙ্গুর দাপটে আরও জটিল হচ্ছে হাম পরিস্থিতি, চাপে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

লন্ডন, ১৯ জুলাই: ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ-এ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিশাল আকারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাম মহামারির মধ্যেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু বাংলাদেশকে নতুন জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে; বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দুই রোগের যুগপৎ আক্রমণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়তে পারে।

ঐ রিপোর্টেে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চলমান ভয়াবহ হাম (মিজলস) প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একসঙ্গে দুটি সংক্রামক রোগের বিস্তার বাংলাদেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। এতে রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তি, চিকিৎসায় বিলম্ব এবং মৃত্যুঝুঁকি—সবই বাড়তে পারে।

বছরের শুরু থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১৪ এবং একজনের মৃত্যু হয়। কিন্তু জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১১০ জনে, আর মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।

অন্যদিকে, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি শুরু হওয়া হাম প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত এক লাখ ১৩ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৭১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ও হাম—দুই রোগেরই প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর ও ত্বকে র‌্যাশ দেখা যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে একটি রোগকে অন্যটি ভেবে ভুল চিকিৎসা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সময়মতো সঠিক তরল চিকিৎসা না পেলে রোগী মারাত্মক শকে চলে যেতে পারেন। আবার হামের চিকিৎসা বিলম্বিত হলে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরীক্ষাগারের সুবিধা সর্বত্র সমান নয়। ফলে রোগ নিশ্চিত করতে দেরি হলে চিকিৎসকরাও জটিল পরিস্থিতিতে পড়েন। এতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও ব্যাহত হতে পারে। কোথাও হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার প্রয়োজন থাকলেও ভুল ধারণার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিলম্ব হতে পারে, আবার উল্টোটাও ঘটতে পারে।

এরই মধ্যে ঢাকার যে হাসপাতালটি আগে ডেঙ্গু চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র ছিল, সেটি এখন হাম রোগীদের জন্য নির্ধারিত হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাও নতুন চাপে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সামনে বর্ষা মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। বৃষ্টির পানিতে এডিস মশার প্রজনন বাড়বে, একই সঙ্গে মানুষ ঘরের ভেতরে বেশি সময় অবস্থান করায় বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো হামও দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। ফলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—ডেঙ্গুর চূড়ান্ত মৌসুমে—দুটি রোগই একযোগে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে হামের টিকাদান কর্মসূচির তথ্যভান্ডার আরও শক্তিশালী করা, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো এবং রোগ শনাক্তে আধুনিক পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও সমন্বিত জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ (The Telegraph), ১৫ জুলাই ২০২৬।