ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বিশ্বকাপে রূপকথার লড়াই, অতিরিক্ত সময়ে কেপ ভার্দেকে হারিয়ে কোনোমতে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা
স্পোর্টস ডেস্ক:
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ উপহার দিল আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দে। কাগজে-কলমে এটি ছিল একপাক্ষিক লড়াই—একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের অনেক নিচে থাকা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। কিন্তু মাঠের খেলায় সেই হিসাব পুরোপুরি বদলে যায়। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলের জয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে লিওনেল মেসির দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও কেপ ভার্দে অসাধারণ শৃঙ্খলাপূর্ণ রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বারবার চাপে ফেলে। বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা যেন একাই দুর্গ রচনা করেন। মেসিসহ আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে তিনি ম্যাচটিকে দীর্ঘ সময় সমতায় রাখেন।

২৯তম মিনিটে লিওনেল মেসির দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তবে পিছিয়ে পড়েও ভেঙে পড়েনি কেপ ভার্দে। দেরয় দুয়ার্তের দৃষ্টিনন্দন গোলে সমতায় ফিরে তারা জানিয়ে দেয়, তারা শুধু অংশ নিতে নয়, লড়াই করতেও এসেছে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই জয়সূচক গোল করতে না পারায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে আবারও নাটকীয়তা। ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে জালে জড়ালে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে ওঠে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী মুহূর্ত।
তবে ম্যাচের অন্যতম আবেগঘন দৃশ্য তৈরি করেন কেপ ভার্দের সিডনি কাবরাল। অতিরিক্ত সময়ে দলের হয়ে গোল করে তিনি আনন্দে গ্যালারিতে উঠে প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরেন। সেই উদযাপনের ছবি মুহূর্তেই বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্তে পরিণত হয়।
গোলরক্ষক ভোজিনহা ছিলেন কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় নায়ক। পুরো ম্যাচে তিনি অন্তত আটটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার মেসির সামনে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি প্রমাণ করেন, বড় মঞ্চে শুধু তারকাই নয়, সাহস ও আত্মবিশ্বাসও ইতিহাস গড়তে পারে।
ম্যাচ শেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও নিজের দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট নন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তিনি বলেন, কেপ ভার্দেকে তারা মোটেও সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেননি। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে অপরাজিত থাকা একটি দলকে হারানো সহজ হবে না, সেটি আগেই জানা ছিল।
মেসির ভাষায়, প্রথম গোল করার পর আর্জেন্টিনা ভেবেছিল নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটে। দল বলের নিয়ন্ত্রণ হারায়, রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে এবং প্রতিপক্ষের ওপর প্রত্যাশিত চাপ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কেপ ভার্দে সমতায় ফিরে আসে এবং পুরো ম্যাচজুড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলে।
মেসি আরও বলেন, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো দলই কাউকে ছাড় দেয় না। তাঁর মতে, এবারের বিশ্বকাপে দলগুলোর মাcmdn-7নের ব্যবধান আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। ফলে প্রতিটি ম্যাচই কঠিন এবং সামান্য ভুলেরও বড় মূল্য দিতে হতে পারে। তাই সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নামার আগে নিজেদের ভুলগুলো দ্রুত শুধরে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
যদিও শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই সঙ্গী হয়েছে, তবু কেপ ভার্দের বিদায়কে কেউ সাধারণ পরাজয় হিসেবে দেখছেন না। বিশ্বকাপে সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর একটি হিসেবে অংশ নিয়ে তারা স্পেন, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনাকে ৯০ মিনিটে হার মানতে না দেওয়া তাদের ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
অন্যদিকে এই জয় আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোয় তুললেও দলের পারফরম্যান্স নিয়ে নতুন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণে দুর্বলতা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সামনে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে Egypt। তবে কেপ ভার্দের বিপক্ষে এই কঠিন পরীক্ষার পর মেসিদের সামনে যে পথ মোটেও সহজ নয়, সেটি স্পষ্ট হয়ে গেছে।
এই ম্যাচের ফলাফলে জয়ী হয়েছে আর্জেন্টিনা, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জয় করেছে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে আন্ডারডগ দলের সাহস, আত্মবিশ্বাস ও লড়াকু মানসিকতার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে এই ম্যাচ।