কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩৭।। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্ধকার বাস্তবতা
উৎসর্গ
“শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য লড়াই করা প্রতিটি নাগরিকের প্রতি’’
রাজনীতি যখন মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার পরিবর্তে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ, এলাকা দখল ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে রূপ নেয়—তখন সেই রাজনীতি আর জনকল্যাণের জায়গায় থাকে না, বরং সহিংসতার একটি বিপজ্জনক কাঠামোতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সংঘটিত একের পর এক হত্যাকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরিসংখ্যানও সেই অস্বস্তিকর চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে। মানবাধিকার সংস্থা Ain o Salish Kendra (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে—মাত্র পাঁচ মাসে দেশে ৩৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫৫ জন নিহত এবং ২,৬৩৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ৭৯টি ঘটনা ছিল দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল কেন্দ্রিক, যেখানে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৪৫ জন আহত হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়—এগুলো প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শোক এবং প্রতিটি ভেঙে যাওয়া জীবনের গল্প।
অন্যদিকে রাজধানীর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ঢাকায় মোট ৯৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি এবং মে মাসে ১৬টি হত্যার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো ইঙ্গিত দেয়, রাজধানীতে নিরাপত্তার পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়; বরং এক ধরনের চাপা সহিংসতা ক্রমাগত জমা হচ্ছে।
ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলোই রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলেও মূল কারণ রাজনীতি নয়, বরং আধিপত্য বিস্তার, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, সালিশের বিরোধ, ফুটপাত ও ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ, ডিশ-ইন্টারনেট ও স্থানীয় চাঁদার ভাগ-বাটোয়ারা।
আদাবরে সালিশ বৈঠকের মধ্যেই একজন রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন, মৌচাকে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরেকজন প্রাণ হারিয়েছেন, হাতিরঝিলে ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা ঘিরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন আর তেজগাঁও ও পল্লবীর ঘটনায়ও একই ধরনের আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠে এসেছে। অর্থাৎ সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার ফিরে আসছে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব।
এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো একটি দলের একক সমস্যা নয়। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে থাকা একটি কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। যখন রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের মাধ্যম, তখন সংগঠনগত শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা সহিংস রূপ নেয়।
আইন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি না থাকলে এই ধরনের সহিংসতা থামানো কঠিন। কারণ অপরাধ যখন রাজনৈতিক ছায়ায় আড়াল পায়, তখন তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে না—এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার সংস্কৃতির অংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সহিংসতা নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ধারণাকেও প্রভাবিত করছে। তারা যদি দেখে রাজনীতি মানেই শক্তি প্রদর্শন, দখলদারি এবং ভয়ভীতি, তাহলে গণতন্ত্রের জায়গায় জন্ম নেয় ভয়ের সংস্কৃতি। তখন রাজনীতি আর সেবা বা আদর্শের জায়গায় থাকে না; সেটি পরিণত হয় ক্ষমতার লড়াইয়ে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা—এগুলো কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আস্থার প্রশ্ন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের ভেতরে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধীদের কোনোভাবেই রাজনৈতিক আশ্রয় না দেওয়া।
একটি সমাজ তখনই নিরাপদ হয়, যখন রাজনীতি মানুষকে রক্ষা করে, ভয় তৈরি করে না। কিন্তু যখন রাজনীতির ভেতর থেকেই সহিংসতা জন্ম নেয়, তখন পুরো সমাজই অনিরাপত্তার মধ্যে পড়ে যায়।
বাংলাদেশ আজ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি—যেখানে প্রশ্ন শুধু সহিংসতার নয়, প্রশ্ন হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক
লন্ডন, ৫ জুলাই ২০২৬