“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৭৪।। আমেরিকার আদলে বাংলাদেশে ডিজিটাল মধ্যবর্তী নির্বাচন : কিছু প্রস্তাব
উৎসর্গ
সেই সাধারণ মানুষের প্রতি, যাঁদের ভোটে ক্ষমতার জন্ম, অথচ যাঁদের কণ্ঠ অনেক সময় ক্ষমতার দরজায় পৌঁছায় না

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু পাঁচ বছর পরপর ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি হলো জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যাঁদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন, তাঁদের কাজের মূল্যায়ন করার অধিকারও জনগণের থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী পাঁচ বছর সাধারণ মানুষের হাতে সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের কার্যকর কোনো নিয়মিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকে না।
নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে যান, প্রতিশ্রুতি দেন, ভোট চান। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি হয়। সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে কি না, সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করছেন কি না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন কি না কিংবা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ কতটা বাড়ছে—এসব বিষয়ে জনগণের মতামত জানার কোনো নিয়মিত, সমন্বিত ও নিরাপদ জাতীয় ব্যবস্থা নেই।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে একটি ডিজিটাল মধ্যবর্তী জনমত যাচাই ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব করা যেতে পারে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন একটি সাংবিধানিক নির্বাচন। সেখানে প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এর মাধ্যমে কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এখানে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা সেই ধরনের সাংবিধানিক নির্বাচন নয়। এটি হবে নির্বাচনের আড়াই বছর পর সরকারের কার্যক্রম, জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণের মতামত জানার একটি ডিজিটাল গণতান্ত্রিক উদ্যোগ। এর ফলাফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সংসদ সদস্যের আসন, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা সরকারের পরিবর্তন ঘটবে না।
আড়াই বছর পর জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আড়াই বছর পর একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশব্যাপী ডিজিটাল মধ্যবর্তী জনমত যাচাই আয়োজন করা যেতে পারে। এতে দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকেরা অংশ নিতে পারবেন।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হবে, নির্বাচনের আড়াই বছর পর সরকার ও জনপ্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছেন, তা জানা। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির পরিস্থিতি সম্পর্কে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা।
এটি হবে জনগণের মূল্যায়ন জানানোর একটি নিয়মিত সুযোগ। সরকারকে ভালো বলতেই হবে কিংবা বিরোধিতা করতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। প্রত্যেক নাগরিক স্বাধীনভাবে নিজের মতামত দিতে পারবেন।
মোবাইল ফোনেই দেওয়া যাবে মতামত
বর্তমানে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের হাতে প্রায় ১৯ কোটি স্মার্টফোন রয়েছে। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার বিস্তারও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সরকারি বা স্বাধীনভাবে পরিচালিত জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে।
সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখ ও প্রয়োজনীয় পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে একজন নাগরিকের অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিশ্চিত করা হবে। একই ব্যক্তি যেন একাধিকবার মতামত দিতে না পারেন, সে জন্য নিরাপদ ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা থাকতে হবে।
তবে পরিচয় যাচাই এবং মতামত সংরক্ষণ করতে হবে সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থায়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ভোটারের ব্যক্তিগত পরিচয়কে তাঁর দেওয়া উত্তরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রাখা যাবে না। অর্থাৎ কে কী মতামত দিয়েছেন, তা যেন সরকার, রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের কেউ জানতে না পারেন।
যাঁদের স্মার্টফোন নেই, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অসুবিধা রয়েছে, তাঁদের জন্য ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা নির্ধারিত নিরপেক্ষ কেন্দ্রে সহায়তাপূর্ণ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। তবে সেখানেও ব্যক্তির মতামতের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
মধ্যবর্তী জনমত যাচাইয়ের ৬টি প্রশ্ন
জরিপটি সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করতে ৬টি মূল প্রশ্ন রাখা যেতে পারে। প্রতিটি প্রশ্নের পাঁচটি উত্তর থাকবে। উত্তরদাতা নিজের অভিজ্ঞতা ও বিবেচনা অনুযায়ী একটি উত্তর নির্বাচন করবেন।
প্রশ্ন ১: বর্তমান সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?
ক. অত্যন্ত সন্তুষ্ট।
খ. সন্তুষ্ট।
গ. মোটামুটি সন্তুষ্ট।
ঘ. অসন্তুষ্ট।
ঙ. একেবারেই অসন্তুষ্ট।
প্রশ্ন ২: আপনার নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য তাঁর দায়িত্ব কতটা পালন করছেন বলে মনে করেন?
ক. অত্যন্ত ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
খ. ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গ. মোটামুটি দায়িত্ব পালন করছেন।
ঘ. প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন না।
ঙ. দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
প্রশ্ন ৩: দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ক. পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
খ. কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
গ. পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে।
ঘ. পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
ঙ. পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
ক. অত্যন্ত ভালো।
খ. ভালো।
গ. মোটামুটি।
ঘ. খারাপ।
ঙ. অত্যন্ত খারাপ।
প্রশ্ন ৫: আগামী আড়াই বছরে সরকারের কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ক. দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কার।
খ. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
গ. আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ঘ. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার উন্নয়ন।
ঙ. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন ৬: আপনার এলাকায় দুর্নীতির সঙ্গে কারা বেশি জড়িত বলে আপনার ধারণা?
ক. সংসদ সদস্য, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য এবং অন্যান্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।
খ. উপজেলা, পৌরসভা ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
গ. রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী।
ঘ. ব্যবসায়ী, ঠিকাদার কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি।
ঙ. এ ধরনের কারও বিরুদ্ধে আমার জানা কোনো অভিযোগ নেই।
এখানে উত্তরদাতার জন্য একটি অতিরিক্ত সুযোগ রাখতে হবে। তিনি চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, পদবি ও অভিযোগের ধরন উল্লেখ করতে পারবেন। তবে নাম উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক হবে না।
বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, উপজেলা ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধি কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে উত্তরদাতা তা জানাতে পারবেন।
আমাদের দেশে অনেক সময় একজন জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ থাকলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেন না। পাঁচ বছরের নির্বাচিত মেয়াদে তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় অভিযোগ জানানো থেকেও বিরত থাকেন। তাই এই গোপন জরিপ তাঁদের কাছে একটি বিকল্প মাধ্যম হতে পারে।
জরিপের ফলাফল মানেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। জরিপে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বেশি অভিযোগ বা ভোট পড়লেই তাঁকে দুর্নীতিবাজ ঘোষণা করা যাবে না। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনেক উত্তরদাতার অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটি হবে স্বাধীন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
এরপর অভিযোগের ধরন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেন এই জরিপকে ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা মিথ্যা অভিযোগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
ভোটারের পরিচয় ও মতামত থাকবে আলাদা এনক্রিপ্টেড ব্যবস্থায়
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ভোটারের নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একজন সাধারণ মানুষ নিজের এলাকার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য কিংবা ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে বিপদে পড়তে পারেন। তাই জরিপে অংশগ্রহণকারীর পরিচয় এবং তাঁর দেওয়া উত্তর সম্পূর্ণ আলাদা এনক্রিপ্টেড ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করতে হবে।
পরিচয় যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হলেও সেই পরিচয়ের সঙ্গে ব্যক্তির দেওয়া মতামত বা অভিযোগের সরাসরি সংযোগ রাখা যাবে না। এমন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে কোনো সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মীও জানতে না পারেন কে কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।
এমনকি জরিপের ফলাফল প্রকাশের সময়ও ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। প্রকাশ করা হবে শুধু সামগ্রিক পরিসংখ্যান, অভিযোগের ধরন এবং এলাকাভিত্তিক ফলাফল।
এই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান এবং পর্যবেক্ষকদের যুক্ত করা যেতে পারে।
ফলাফল প্রকাশ ও সরকারের করণীয়
জরিপ শেষ হওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ফলাফলও প্রকাশ করা যেতে পারে। তবে যেখানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুব কম, সেখানে ব্যক্তিগত পরিচয় অনুমানের ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন রাখতে হবে।
কোনো এলাকায় সংসদ সদস্যের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ বেশি হলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের কাছে তার ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। কোনো মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিলে সংসদীয় কমিটিতে বিষয়টি আলোচনা হতে পারে। কোনো এলাকায় দুর্নীতির অভিযোগ বেশি পাওয়া গেলে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সরকারের উচিত হবে জরিপের ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করণীয় নির্ধারণ করা। কোন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে, কোথায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কোন সমস্যার সমাধান হয়নি—এসব বিষয়ে নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করা যেতে পারে।
এতে শুধু জনগণের মতামত সংগ্রহ করেই দায়িত্ব শেষ হবে না; বরং সেই মতামতের ভিত্তিতে সরকারের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে
এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও সহযোগিতা প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন দলকে যেমন নিজেদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের মূল্যায়ন গ্রহণ করতে হবে, তেমনি বিরোধী দলগুলোকেও এই ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে।
জরিপে কোনো দল বা জনপ্রতিনিধির পক্ষে কিংবা বিপক্ষে প্রচারণা চালানো যাবে না। দলীয় কর্মীদের দিয়ে ভোট প্রভাবিত করা, ভয় দেখানো কিংবা অর্থের বিনিময়ে মতামত আদায়ের চেষ্টা প্রতিরোধ করতে হবে।
জরিপ পরিচালনার দায়িত্ব এমন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন বা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতে পারে, যার পরিচালনা পর্ষদে নির্বাচন, প্রযুক্তি, পরিসংখ্যান, আইন ও নাগরিক অধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা থাকবেন। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবমুক্ত থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল ভোটের ফলাফল স্বাধীনভাবে অডিট করার ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।
পাঁচ বছর অপেক্ষা নয়, জনগণের মূল্যায়ন হোক আড়াই বছরেই
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মূল শিক্ষা হলো, জাতীয় নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়েও জনগণের রাজনৈতিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেই সাংবিধানিক ক্ষমতা পরিবর্তনের বিষয়টি থাকবে না; থাকবে জনগণের মতামত ও জবাবদিহির ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে এই উদ্যোগ চালু হলে জনগণ পাঁচ বছর অপেক্ষা না করেই আড়াই বছর পর সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন জানাতে পারবেন। সরকারও বুঝতে পারবে কোন সিদ্ধান্তে জনগণ সন্তুষ্ট, কোন ক্ষেত্রে অসন্তোষ বাড়ছে এবং কোথায় জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।
তবে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করার আগে প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো, তথ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই, ভোটারের গোপনীয়তা এবং স্বাধীন তদারকির বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় চালু করে অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতে পারে। পরে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগণ শুধু নির্বাচনের দিন রাষ্ট্রের মালিক নন। নির্বাচনের পরও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের মতামত, প্রত্যাশা ও অধিকার গুরুত্বপূর্ণ।
যে জনপ্রতিনিধি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁর কাজের মূল্যায়ন করার অধিকার জনগণের রয়েছে। যে সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তারও উচিত নিয়মিত জনগণের কাছে নিজেদের কর্মকাণ্ডের হিসাব দেওয়া।
গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র মানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় রাখা।
তাই আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধারণা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি ডিজিটাল মধ্যবর্তী জনমত যাচাই ব্যবস্থা চালু করা সময়োপযোগী চিন্তা হতে পারে। এতে ক্ষমতার পরিবর্তন না ঘটলেও ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে জনগণের মূল্যায়ন স্পষ্ট হবে। দুর্নীতির অভিযোগ আড়ালে থাকবে না, জনপ্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং সরকারও নিজের কাজের দুর্বলতা শনাক্ত করার সুযোগ পাবে।
পাঁচ বছর পরপর শুধু ব্যালট বাক্সে জনগণের মতামত নেওয়ার পরিবর্তে প্রতি আড়াই বছর পর ডিজিটাল মাধ্যমে তাঁদের মূল্যায়ন জানার সুযোগ তৈরি হলে গণতন্ত্রের চর্চা আরও নিয়মিত ও অংশগ্রহণমূলক হতে পারে।
ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে আসে। সেই ক্ষমতার জবাবদিহিও জনগণের কাছেই থাকতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৫ নভেম্বর, ২০২৬