কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৬ ।।‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজার দোষে প্রজার কষ্ট, রাজ্য কষ্ট পায়’

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৬ ।।‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজার দোষে প্রজার কষ্ট, রাজ্য কষ্ট পায়’

 কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৬ ।।

‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজার দোষে প্রজার কষ্ট, রাজ্য কষ্ট পায়’

আমাদের দেশে একটি বহুল বাংলা প্রবাদ বাক্য হচ্ছে, ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়‘। আজকে দেশের সার্বিক দিক বিবেচনা করে প্রবাদটির অনুকরনে নিজে একটা নতুন শিরোনাম তৈরি করে উপরোক্ত টাইটেল দেওয়া। প্রচলিত প্রবাদটি আংশিক সত্য। কারণ আমি বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখছি, প্রজার দোষেও রাজ্য নষ্ট হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায় চাপাই সরকার, শাসকগোষ্ঠী বা ক্ষমতাসীন নেতাদের ওপর। কথাটি পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না—শাসকের ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও অদক্ষতা যে রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দায় কি শুধু ‘রাজার’? নাকি ‘প্রজার’ ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়? এই জায়গাতেই প্রবাদটি গভীর অর্থ বহন করে—রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট হয়, প্রজার দোষে প্রজার কষ্ট বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত রাজ্যই কষ্ট পায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা এই কথার নির্মম সাক্ষ্য দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যর্থতা, যমুনা ও পদ্মা নদীর পানি নিয়ন্ত্রণে অপ্রস্তুতি, প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনের পুনরাবৃত্তি—এসব কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল নয়। দুর্যোগ এলেই আমরা দেখি মানুষের অসচেতন আচরণ, সরকারি নির্দেশনা না মানা, দখলদারি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, এমনকি ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা। ফলে সংকট আরও গভীর হয়, কষ্ট বাড়ে সাধারণ মানুষেরই, আর রাষ্ট্র পড়ে চাপে।

সড়ক দুর্ঘটনার চিত্রও একই বাস্তবতার প্রতিফলন। আইন আছে, নিয়ম আছে, ট্রাফিক পুলিশও আছে—তবু প্রতিদিন প্রাণ ঝরে। কারণ কী? চালকের বেপরোয়া মনোভাব, পথচারীর অসতর্কতা, যানবাহনের ফিটনেস না মানা, ঘুষ দিয়ে ছাড় পাওয়ার সংস্কৃতি। এখানে সরকার এককভাবে দায়ী হলেও, নাগরিক দায়িত্ববোধের অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। প্রজার দোষেই প্রজার কষ্ট বাড়ে।

অর্থনীতির দিকে তাকালেও চিত্র ভিন্ন নয়। ব্যবসায়িক অনিয়ম, কর ও ভ্যাট ফাঁকি, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি—এসবকে আমরা প্রায়ই রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত করি। কিন্তু বাস্তবে কর ফাঁকি দেয় কারা? ঘুষ দেয় কারা? ভুয়া বিল করে অর্থ লোপাট করে কারা? রাষ্ট্র তো মানুষ দিয়েই গঠিত। বাংলাদেশে প্রতিবছর ভ্যাট ও কর ফাঁকির কারণে লক্ষ কোটি টাকার রাজস্ব হারায় সরকার। এই অর্থ যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আসত, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ অনেক বেশি হতো। এখানে রাজ্যের ক্ষতির মূলেও রয়েছে প্রজার অনৈতিকতা।

শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার অভাব এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নাগরিক দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার চর্চা কার্যত অনুপস্থিত। ফলে মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ দেখেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। রাস্তার নিয়ম ভাঙা, পরিবেশ দূষণ, সরকারি সম্পদ নষ্ট করা, আইনকে ফাঁকি দেওয়াকে ‘চালাকির’ লক্ষণ মনে করা—এসব আচরণ রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। সরকার যতই উন্নয়ন পরিকল্পনা নিক, নাগরিক আচরণ যদি বিপরীতমুখী হয়, উন্নয়ন টেকসই হয় না।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও একই সত্য স্পষ্ট। নির্বাচন এলেই ভোটার সচেতনতার অভাব, গুজব, বিভাজনমূলক রাজনীতি ও সহিংসতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত হলে, প্রশ্ন করার সংস্কৃতি দুর্বল হলে, শাসকগোষ্ঠী জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়। এতে শাসক যেমন স্বেচ্ছাচারী হয়, তেমনি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত কষ্ট পায় সাধারণ মানুষই।

অতএব, এই প্রবাদ কেবল কোনো নীতিকথা নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট হয়—এ কথা সত্য। কিন্তু প্রতিটি প্রজার দোষে সমষ্টিগতভাবে সব প্রজারই কষ্ট বাড়ে, আর সেই কষ্টের ভার এসে পড়ে পুরো রাষ্ট্রের ওপর। শাসক ও নাগরিক—দু’পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই এগোতে পারে না।

শেষ কথা হলো, রাষ্ট্র কেবল সরকারের সম্পত্তি নয়; এটি আমাদের সবার। নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ, আইন মানা, কর প্রদান, সচেতন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নৈতিক অবস্থান—এই গুণগুলোই একটি জাতিকে শক্তিশালী করে। নচেৎ, প্রজার দোষে রাজ্য ক্ষয় হতে থাকবে, আর সেই ক্ষয়ের দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না কারও।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ৬ জানুয়ারি ২০২৬