কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭২ ।। ইসলাম, নারীর নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: কুরআন–সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ
উৎসর্গ
যাঁরা শুধু বিভিন্ন মানুষের কথা শুনে শুনে নয়, বরং নিজে পড়াশোনা করে, কিছু যাচাই করে, জেনে-বুঝে নিজ নিজ ধর্ম পালন করেন-সেইসব মানুষদের উদ্দেশ্যে
একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের কিছু নেতা ও ধর্মীয় বক্তা প্রায়ই বলেন, “ইসলামে নারী নেতৃত্ব নেই” বা “নারীর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব অবৈধ।” কিন্তু এই বক্তব্যগুলো কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর সরাসরি পাঠের সঙ্গে কি সামঞ্জস্যপূর্ণ ? বরং ইসলামের প্রাথমিক যুগের বাস্তব ইতিহাস আমাদের ভিন্ন চিত্র দেখায়—যেখানে নারীরা সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি এবং এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কিছুই করতেন না। সুতরাং তাঁর সময়ে নারীদের যেসব দায়িত্ব ও অংশগ্রহণ দেখা যায়, তা ইসলামের নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আসুন একটু বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। এসব তথ্য নিশ্চয় এ লেখকের কোন বানানো মতামত নয়। একজন মুসলিম হিসাবে বানিয়ে বানিয়ে লেখা তো অবশ্যই বিধিসম্মত নয়। তাই পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন ও সহি হাদিসের আলোকে এই বিশ্লেষণ। এরপরেও যদি কারো কোন আপত্তি বা কোন ধরনের প্রশ্ন থাকে তাহলে আমাদের কোছে লিখতে পারেন। আমরা সাদরে তাদের লেখা প্রকাশ করবো।
আর সকল পাঠকের কাছে একান্ত আবেদন থাকবে, এই প্রার্থনা করার জন্য যে, এ ধরনের কলাম লিখতে গিয়ে যেন সব সময় সত্যের উপর অবিচল থাকতে পারি। মহান আল্লাহর কাছে আবেদন করবো যে, তিনি যেন ‘সুরা আসরে’ যা বর্ণনা করেছেন, তা সব সময় পালন করার সুযোগ দেন এই বান্দাকে। আর মূলত এজন্যই প্রতিদিন সময় বের করে, একটা করে কলাম লেখার প্রচেষ্টা।
সুরা আল-আসর এর বাংলা অনুবাদ তুলে দিচ্ছি পাঠকদের জন্য। (১. শপথ সময়ের (আসরের) ২. নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। ৩. তবে তারা নয়—যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে)।
কুরআন: মর্যাদা ও নেতৃত্বের মানদণ্ড
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে… নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।”
(সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩)
এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মর্যাদার মানদণ্ড লিঙ্গ নয়, তাকওয়া ও নৈতিকতা।
আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন,
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের সহায়ক; তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।”
(সূরা তাওবা ৯:৭১)
এই আয়াত নারী ও পুরুষের যৌথ সামাজিক নেতৃত্বের ভিত্তি স্থাপন করে।
কুরআনে নারী শাসকের দৃষ্টান্ত
সূরা নামলে আল্লাহ তায়ালা সাবা দেশের ( সাবা দেশটি আজকের ইয়েমেন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ছিল বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্য নির্দেশ করে। প্রাচীন সাওয়িলেন্ডে এই রাজ্য বণিজ্যিকভাবে খ্যাত ছিল ও দামী জিনিসপত্রের বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ছিল) একজন নারী শাসকের কথা উল্লেখ করেছেন—
“আমি দেখলাম, এক নারী তাদের উপর রাজত্ব করছে, এবং তাকে সবকিছুই দেওয়া হয়েছে, আর তার একটি মহান সিংহাসন রয়েছে।”
(সূরা নামল ২৭:২৩)
তিনি পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতেন:
“হে সভাসদগণ! তোমরা আমার এ বিষয়ে পরামর্শ দাও। আমি কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই না, যতক্ষণ না তোমরা উপস্থিত থাকো।”
(সূরা নামল ২৭:৩২)
কুরআন কোথাও তাঁর শাসনকে অবৈধ বলেনি। বরং প্রজ্ঞা ও শালীনতার সঙ্গে তাঁর চরিত্র তুলে ধরেছে।
রাসুল (সা.)-এর যুগে নারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভূমিকা
১. রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
মুমিন নারীরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে সরাসরি বায়‘আত দিয়েছেন।
“হে নবী! যখন মুমিন নারীরা তোমার কাছে এসে বায়‘আত করে…”
(সূরা মুমতাহিনা ৬০:১২)
বায়‘আত ছিল রাজনৈতিক আনুগত্যের শপথ।
২. শিক্ষা ও ফিকহে নেতৃত্ব
হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন ইসলামী ফিকহ ও হাদিসের অন্যতম প্রধান কর্তৃত্ব। বহু সাহাবি তাঁর কাছ থেকে ফতোয়া নিতেন। তিনি প্রায় দুই হাজারের বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৩. অর্থনৈতিক নেতৃত্ব
হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন তখনকার আরবের সবচেয়ে স্বনামধন্য ধনী ব্যবসায়ী। তিনি নিজে ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং কর্মচারী নিয়োগ দিতেন। আমাদের নবী (সা:) তরুণ বয়সে তাঁরই পুঁজিতে ব্যবসা করেছেন।
৪. চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা
উহুদের যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা.) ও উম্মে সুলাইম (রা.) আহতদের পানি পান করাতেন ও চিকিৎসা করতেন।
সহিহ বুখারিতে এসেছে,
“আমি উহুদের দিনে আয়েশা ও উম্মে সুলাইমকে দেখেছি, তারা লোকদের পানি পান করাচ্ছিলেন।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস ২৮৮০)
৫. যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা
উম্মে উমারা নুসাইবা বিনতে কা‘ব (রা.) উহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা.)-কে ঘিরে প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেন।
রাসুল (সা.) বলেন,
“উহুদের দিনে আমি যেদিকেই তাকিয়েছি, উম্মে উমারাকে আমাকে রক্ষা করতে দেখেছি।”
(মুসনাদ আহমদ)
৬. নৌ অভিযানে অংশগ্রহণ
রাসুল (সা.) বলেন,
“আমার উম্মতের প্রথম যে দল সমুদ্রযুদ্ধে অংশ নেবে, তাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব।”
(সহিহ বুখারি)
উম্মে হারাম (রা.) সেই নৌ অভিযানে অংশ নেন এবং শাহাদাত বরণ করেন।
নবী (সা.) কি নারীদের বাইরে কাজ করতে নিষেধ করেছিলেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের ঘরের বাইরে প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর কাজে অংশগ্রহণে নিষেধ করেননি। বরং বাস্তবে তিনি নারীদের শিক্ষা, চিকিৎসা, দাওয়াহ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন—শালীনতা ও পর্দা বজায় রেখে।
একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন,
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।”
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এখানে নারী-পুরুষ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
একটি হাদিসে, যখন উম্মে ওয়ারাকা (রা.) যুদ্ধের জন্য চিকিৎসা ও যত্ন সারতে চান, রাসুল (সা.) তাঁকে সরাসরি যুদ্ধের মূল ফ্রন্টে পাঠাননি, কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা ও ইচ্ছাকে সম্মান জানান এবং বলেন আল্লাহতায়ালা তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন।
(ইবন সা’দ)
আমরা জানি, রাসুল্লাহ (সা:) এর সময়ে ইসলামের জন্য যিনি ‘প্রথম শহীদ’ হন তিনি একজন নারী, কোন পুরুষ নন। তাঁর নাম ছিল হযরত সুমাইয়া (রা:)।
২১শতকে নারীর নেতৃত্ব: কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিকোণ
আজকের দিনে যখন কেউ বলে “ইসলামে নারী নেতৃত্ব নেই”, তখন মূলত তারা সামাজিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা বড়িয়ে দেন। কিন্তু:
- কুরআন নারীদের মর্যাদা, দায়িত্ব ও ন্যায়ের ভিত্তিতে নেতৃত্বের উপযোগিতা স্পষ্ট করে। (সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩)
- ইসলাম রাষ্ট্র সেবায় নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাস ও উদাহরণ প্রদান করে।
- রসুল (সা.) নিজে নারীদের বিদ্বত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, সৈনিকহিসাবে সেবা স্বাগত করেছেন — শর্তসহ এবং ইসলামী শালীনতা মানিয়ে দিয়ে।
- ইসলামে নারী নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিষিদ্ধ—এমন কোনো স্পষ্ট দলিল কুরআন বা সহিহ হাদিসে নেই। বরং কুরআন ও রাসুল (সা.)-এর জীবনের বাস্তব উদাহরণ প্রমাণ করে যে, নারী ও পুরুষ উভয়ই যোগ্যতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
- অতএব আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধর্মের নামে নারী নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলা কুরআন-সুন্নাহর মূল শিক্ষার প্রতিফলন নয়; বরং তা সমাজ ও সংস্কৃতিনির্ভর ব্যাখ্যার ফল।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইসলাম কখনো নারীর নেতৃত্ব, দায়িত্ব বা জনসেবাকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেনি। বরং কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাস্তবে দেখা যায় নারীরা সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রয়োজনে যুদ্ধ-পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমান সময়ে নারীর নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করা অনেক সময় সমাজ-সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব থেকে আসে, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে নয়। আবার ইসলামে নারী-পুরুষ সকলের জ্ঞান অর্ঝনকে ‘ফরজ’ ঘোষণা করেছে। বিশ্বের অর্ধেক হচ্ছেন নারী। ইসলামিক দৃষ্টিতে, সরকারী এবং দরকারী কাজে নারীদের অংশগ্রহণ না-জায়েজ নয়। তবে তা নৈতিক সীমা ও দায়িত্বের সাথে অনুষ্ঠিত হতে হবে—এটাই মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মীয় সমতা নিশ্চিত করে। এটা পুরুষের জন্যও বটে। আর নারীর নেতৃতৃ্ব যদি অবৈধ হয় তাহলে বিগত দিনে কিভাবে বাংলাদেশের দুইজন নারীর নেতৃত্বে কিছু কিছু ইসলামিক দল একত্রে কাজ করলেন?
সুতরাং এ আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বুঝতে পারলাম, ইসলামে নারী নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিষিদ্ধ—এমন কোনো স্পষ্ট দলিল কুরআন বা সহিহ হাদিসে নেই। বরং কুরআন ও রাসুল (সা.)-এর জীবনের বাস্তব উদাহরণ প্রমাণ করে যে, নারী ও পুরুষ উভয়ই যোগ্যতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
অতএব আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধর্মের নামে নারী নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ অবৈধ বলা কুরআন-সুন্নাহর মূল শিক্ষার প্রতিফলন নয়; বরং তা সমাজ ও সংস্কৃতিনির্ভর ব্যাখ্যার ফল।
রেফারেন্স
১. আল-কুরআন: সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩
২. আল-কুরআন: সূরা নামল ২৭:২৩–৩২, ৪৪
৩. আল-কুরআন: সূরা তাওবা ৯:৭১
৪. আল-কুরআন: সূরা মুমতাহিনা ৬০:১২
৫. সহিহ বুখারি, কিতাবুল জিহাদ, হাদিস ২৮৮০
৬. সহিহ বুখারি, কিতাবুল জিহাদ (সমুদ্রযুদ্ধের হাদিস)
৭. সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারা
৮. মুসনাদ আহমদ, হাদিস: উম্মে উমারা (রা.)
৯. সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম: “কুল্লুকুম রা‘ইন” হাদিস
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ৬ ফেব্রূযারি ২০২৬