কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭১ ।। হারিয়ে গেলেন প্রেসক্লাবের এক সাহসী কণ্ঠ

উৎসর্গ
সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক কায়সারুল ইসলাম সুমনের স্মৃতির প্রতি
কিছু মানুষ চলে গেলে পৃথিবী থেমে যায় না, কিন্তু মানুষের ভেতরের পৃথিবীটা কেঁপে ওঠে। সাংবাদিক কায়সারুল ইসলাম সুমনের মৃত্যু ঠিক তেমনই এক ঝাঁকুনি—যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন কতটা ভঙ্গুর, আর ভালোবাসা কতটা গভীর।
লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সদস্য সুমন লন্ডন ও বার্মিংহামের সাংবাদিক সমাজে ছিলেন এক উজ্জ্বল মুখ। এটিএন বাংলা ইউকের ব্যুরো প্রধান, বাংলা প্রেসক্লাব বার্মিংহাম মিডল্যান্ডসের সহসভাপতি—এসব পরিচয় তার কাজের পরিধি বোঝায়, কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন আরও বড় কিছু। তিনি ছিলেন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এক সাহসী কণ্ঠ, কমিউনিটির মানুষের পাশে থাকা এক নির্ভরতার নাম।
৪ জানুয়ারির সেই ভোরের খবরটি যেন বিশ্বাস করার মতো ছিল না। বড়লেখায় অবস্থানকালে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই থেমে যাওয়া হৃদস্পন্দন—সবকিছুই যেন খুব দ্রুত ঘটে গেল। জীবনের শেষ দিনটিতে তিনি স্ত্রীকে লন্ডনের উদ্দেশে বিদায় দিয়েছিলেন। কে জানত, সেটিই হবে তাদের শেষ দেখা। এই এক মুহূর্তই পুরো ঘটনাকে আরও নির্মম, আরও অসহনীয় করে তোলে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে দেশের বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা, বার্মিংহাম এবং লন্ডনে—তিন জায়গাতেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তাঁর চলে যাওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়া, প্রেসক্লাবের গ্রুপ, সহকর্মীদের স্ট্যাটাস—সব জায়গায় একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়েছে: অবিশ্বাস। এত মানুষের ভালোবাসা, এত মানুষের শোক—হয়তো তিনিও জানতেন না, তার উপস্থিতি কত মানুষের জীবনে আলো হয়ে ছিল। একটু আগে, অনুজপ্রতিম পুরানো সহকর্মি গল্পকার সাঈম চৌধুরীর ‘সুমনের জন্য শোকগাঁথা‘ পড়ে মনটা আরও বিষ্ন্ন হয়ে গেল প্রয়াত সুমন ভাইয়ের জন্য। সুমন যে কি প্রাণবন্ত আর সতেজ গাল্পিক মানুষ ছিলেন সাঈমের লেখায় তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে।
বার্মিংহামের গণমাধ্যম মহলে তিনি পরিচিত ছিলেন স্পষ্টবাদী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে। প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সমস্যা, সংকট, সম্ভাবনা ও স্বপ্ন—সবকিছুই তার লেখায় উঠে এসেছে আন্তরিকতার সঙ্গে। তিনি সংবাদকে কখনো কেবল তথ্যের খোলসে বন্দি রাখেননি; মানুষের বেদনা, আনন্দ ও লড়াইকে তিনি তুলে ধরেছেন হৃদয়ের গভীর থেকে।
আজ তিনি নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তার লেখা, তার সততা, তার সাহস। রয়ে গেছে সেই দৃষ্টান্ত, যা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দেবে—সাংবাদিকতা মানে কেবল খবর লেখা নয়, সাংবাদিকতা মানে মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো।
তার অকাল প্রয়াণে আমরা হারালাম একজন সহকর্মী, একজন বন্ধু, একজন সত্যের সৈনিক। শোকাহত পরিবার, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দিন—আমিন।
কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন, তাদের কর্মে, তাদের স্মৃতিতে, মানুষের ভালোবাসায়। কায়সারুল ইসলাম সুমন তেমনই একজন।
সুমন ভাইয়ের মৃত্যু আমাদের সামনে জীবনের এক গভীর বার্তা তুলে ধরেছে। যেখানে আমরা দেখতে পাই—জীবন আসলে কত ছোট, আর ভালোবাসা কত বড়। তিনি সংবাদকে শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি; তিনি মানুষের গল্পকে নিজের গল্প বানিয়ে বলতেন। তার স্পষ্টবাদিতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন সাংবাদিকতার এক জীবন্ত পাঠশালা।
আজ তিনি নেই। কিন্তু তার সততা আছে, তার সাহস আছে, তার কাজ আছে। তিনি আমাদের ভাবনার দরজা খুলে দিয়ে গেছেন। মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে আছেন—স্মৃতিতে, ভালোবাসায়, অনুপ্রেরণায়।
আমরা শোকাহত। আমরা ব্যথিত। কিন্তু তার জীবন আমাদের শেখায়—মানুষ আসলে তার কাজেই অমর হয়।
মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য দান করুন। আর আমাদের সবাইকে মনে করিয়ে দিন—জীবন ক্ষণিক, কিন্তু ভালোবাসা চিরস্থায়ী।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬