নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্রুত চুক্তি সইয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
ঢাকা প্রতিনিধি, ৭ ফেব্রুয়ারি :
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে এসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করছে। রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন আয়োজনই যেখানে সরকারের মূল দায়িত্ব ছিল, সেখানে বন্দর, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও কৌশলগত অবকাঠামো নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক চুক্তিতেই গোপনীয়তার ধারা থাকায় জনমনে সংশয় আরও বেড়েছে।
চুক্তিগুলোর সম্ভাব্য আর্থিক পরিমাণ (সংক্ষেপে)
(উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে আনুমানিক হিসাব)
- চীনের ২০টি যুদ্ধবিমান ক্রয়: প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা
- ড্রোন উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি: কয়েক শ’ কোটি থেকে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
- ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান (ইতালি): প্রতিটি বিমানের সম্ভাব্য মূল্য ৮০০–১,০০০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশের জন্য মোট ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার)
- ব্ল্যাক হক মাল্টিরোল হেলিকপ্টার: প্রতিটি ২০–২৫ মিলিয়ন ডলার, মোট ব্যয় শত মিলিয়ন ডলারের বেশি
- টি১২৯ অ্যাটাক হেলিকপ্টার (তুরস্ক): প্রতিটি ৩০–৫০ মিলিয়ন ডলার
- সাবমেরিন (দক্ষিণ কোরিয়া): প্রতিটি ৫০০–৭০০ মিলিয়ন ডলার
- বন্দর ও টার্মিনাল চুক্তি (এপিএম টার্মিনালস, ডিপি ওয়ার্ল্ড, মেডলগ): দীর্ঘমেয়াদি ইজারা—মূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি
- জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (EPA): বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিলিয়ন ডলারের প্রভাব
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক চুক্তি: বাণিজ্য প্রবাহে শত মিলিয়ন ডলারের প্রভাব
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ: ভূরাজনৈতিক ঝোঁক কি অগ্রাধিকার বদলে দিচ্ছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন—নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে এ ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির নেই। তার মতে, সরকারের সাম্প্রতিক তৎপরতা দেখায় যে তারা ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল খাতগুলোতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা বাড়াতে পারে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো অগ্রগতি না হওয়া, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন উষ্ণতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতি—সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনে বেশি ঝুঁকছে।
প্রতিরক্ষা খাতে বড় বড় ক্রয়চুক্তি—যেমন যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন, হেলিকপ্টার—ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর আর্থিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলেও তারা মনে করেন।
বন্দর খাতে অচলাবস্থা
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে বন্দরকর্মীরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাওয়ায় বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন—এ ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে।
উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা দেশে স্থায়ীভাবে থাকেন না এবং কারো কারো দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে—এমন অভিযোগও জনমনে সন্দেহ বাড়িয়েছে। জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো দ্রুত সম্পাদনের চেষ্টা তাই আরও বিতর্ক তৈরি করছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, সাম্প্রতিক চুক্তিগুলোতে স্বচ্ছতার ঘাটতি স্পষ্ট। তার মতে, “রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত জবাবদিহি। কিন্তু প্রক্রিয়াগত সতর্কতার অভাব ও অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করায় নানা প্রশ্ন উঠছে।”
নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক চুক্তি সই—যার আর্থিক পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত—দেশের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। রাষ্ট্র সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা থাকলেও সরকারের অগ্রাধিকার ও তৎপরতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।