স্কটল্যান্ডে গৃহহীনতার ভয়াবহ রেকর্ড: অস্থায়ী আশ্রয়ে বন্দি ১০ হাজার শিশু

স্কটল্যান্ডে গৃহহীনতার ভয়াবহ রেকর্ড: অস্থায়ী আশ্রয়ে বন্দি ১০ হাজার শিশু

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক রিপোর্ট, ৭ ফেব্রুয়ারি:  স্কটল্যান্ডের বড় বড় শহরের রাস্তাঘাট, গলিপথ আর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো যেন আজ গৃহহীনদের নীরব আর্তনাদে ভরে আছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে—দেশজুড়ে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আবারও সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্যটি হলো, এই অস্থায়ী আশ্রয়ে আটকে আছে ১০ হাজারেরও বেশি শিশু; যাদের শৈশবের নিরাপত্তা, স্থিরতা আর স্বপ্ন আজ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।


হাউজিং-এ নতুন আবেদন কমলেও সংকটের তীব্রতা কমেনি। বরং স্কটল্যান্ডের দুই বৃহত্তম শহর—গ্লাসগো ও এডিনবারায় পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে স্থানীয় কাউন্সিলগুলো আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। যাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার কথা, তারাই এখন অসহায়ভাবে স্বীকার করছে—চাহিদা মেটানোর মতো ঘর নেই। সাশ্রয়ী বাসস্থানের অভাব, শরণার্থী ও অভিবাসীদের চাপ এবং স্থানীয় সরকারের সীমিত সম্পদ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল মানবিক বিপর্যয়, যার প্রভাব পড়ছে শিশুদের ভবিষ্যৎ, পরিবারগুলোর মানসিক স্বাস্থ্য এবং সমাজের স্থিতিশীলতার ওপর।

সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, স্কটল্যান্ডে গত বছর গৃহহীনতার আবেদন ছিল ৪০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে গ্লাসগোতেই জমা পড়েছে ৮০৯২টি—অর্থাৎ পুরো দেশের এক-পঞ্চমাংশ। শহরটিতে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন, যার মধ্যে ২৬০০-এর বেশি মানুষ হোটেল ও B&B-তে থাকতে বাধ্য। প্রতিটি রাত তাদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা, নতুন উদ্বেগ।

সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে বিদেশ থেকে আসা মানুষের ঢল। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে গ্লাসগোতে ১৪২০ জন আবেদনকারীকে গৃহহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের কোনো স্কটিশ কাউন্সিল এলাকার সঙ্গে স্থানীয় সংযোগ নেই। এর মধ্যে ৭৯৫ জন গ্লাসগোতেই আবেদন করেছেন—যা পুরো স্কটল্যান্ডের অ-স্থানীয় আবেদনকারীদের অর্ধেকেরও বেশি। অন্যদিকে, স্থানীয় সংযোগ থাকা আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল ২২১৫। এডিনবারায় যেখানে অ-স্থানীয় আবেদন মাত্র ৮%, গ্লাসগোতে তা ২৫%—যা শহরটিকে একা লড়াই করতে বাধ্য করছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আবেদনকারীদের জাতিগত বৈচিত্র্যও বাড়ছে। শ্বেত স্কটিশ আবেদনকারীর হার কমলেও আফ্রিকান, এশিয়ান ও আরব আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়েছে। ৪২৯ জন জানিয়েছেন—আশ্রয়প্রার্থী থাকার জায়গা ছাড়তে বাধ্য হওয়াই তাদের গৃহহীনতার কারণ। একই সময়ে রাস্তায় ঘুমানোর সংখ্যাও বেড়েছে—৮% থেকে ১০%—যা এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাঁড়িয়েছে ৩৮৭২ জনে।

গৃহহীনতা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো একসুরে সতর্ক করছে—এভাবে চলতে পারে না। Crisis Scotland-এর নীতিনির্ধারণ প্রধান মেভ ম্যাকগোল্ডরিক বলেছেন, এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে গৃহহীনতা ব্যবস্থার ওপর কী ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাস্তায় ঘুমানোর সংখ্যা বাড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। Scottish Federation of Housing Associations-এর প্রধান রিচার্ড মিডে বলেছেন, আধুনিক স্কটল্যান্ডে এমন গৃহহীনতার মাত্রা অগ্রহণযোগ্য। হাজারো পরিবার ও শিশুর জীবনে যে দুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে, তা আর চলতে দেওয়া যায় না। নিরাপদ, উষ্ণ ও সাশ্রয়ী ঘর নির্মাণ ছাড়া এই সংকটের সমাধান অসম্ভব।
গ্লাসগো সিটি কাউন্সিলও সতর্ক করেছে যে যথাযথ অর্থায়ন ছাড়া এই চাহিদা সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠছে। তাদের ভাষায়, স্থানীয় সংযোগ নীতি তারা সমর্থন করলেও এর আর্থিক চাপ গ্লাসগোর মতো শহরের ওপর কীভাবে পড়ে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শহরটি যে স্কটল্যান্ডের তুলনায় অনেক বেশি চাপ বহন করছে, তা পরিসংখ্যানই প্রমাণ করছে।

স্কটল্যান্ডের এই আবাসন সমস্যা জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা একান্ত প্রয়োজন— কারণ  হাউজিং সমস্যা হাজারো জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রাম। গ্লাসগোর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মা হয়তো আজও ভাবছেন—তার সন্তানদের জন্য আগামী রাতের ঘুমের জায়গা কোথায় হবে। এডিনবারার কোনো অস্থায়ী হোস্টেলে হয়তো আরেকটি পরিবার অপেক্ষা করছে—কবে তারা “অস্থায়ী” শব্দটির বোঝা থেকে মুক্তি পাবে। সংকটের এই গভীরতা দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছে, কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানে আরও একটি পরিবার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া।