যুক্তরাজ্য–ফ্রান্স আশ্রয় নীতি নিয়ে জাতিসংঘের কঠোর সতর্কতা
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক লন্ডন, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথভাবে চালু করা বিতর্কিত “ওয়ান ইন, ওয়ান আউট” আশ্রয় নীতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করতে পারে বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। নয়জন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ—যাদের মধ্যে সাতজন বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার—দুই দেশের সরকারকে পাঠানো ২০ পৃষ্ঠার এক চিঠিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঠানো ওই চিঠিতে বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন, কীভাবে এই নীতির আওতায় আটক হওয়া শরণার্থীরা অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছেন। ৬০ দিনের সময়সীমা শেষে শুক্রবার চিঠিটি প্রকাশ করা হয়।
নির্যাতিতদের ওপর নির্যাতন—জাতিসংঘের ভয়াবহ বর্ণনা
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে—
সুদান, গাজা, ইরিত্রিয়া, ইয়েমেন ও ইরান থেকে আসা বহু আশ্রয়প্রার্থী, যাদের অনেকেই নির্যাতন ও মানবপাচারের শিকার, তাদেরকে জোরপূর্বক ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর আগে আটক রাখা হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ভাষায়—
“নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের আটক রাখা নিজেই নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”
চিঠিতে যে ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—
- ইরিত্রিয়ার এক ব্যক্তিকে জুতা পরতে দেওয়া হয়নি, মাথায় হুড পরিয়ে মাটিতে ফেলে রাখা হয়, এমনকি তার ঘাড়ে নিরাপত্তারক্ষীর বুট চাপা দেওয়া হয়।
- ইয়েমেনের এক নারী, যিনি দাবি করেছেন তিন বছর বয়স থেকে দাসত্বের শিকার, তাকে হোম অফিস জানায়—তার মানবপাচারের গল্প “বিশ্বাসযোগ্য নয়”, কারণ তিনি আগমনের সময় তা জানাননি।
- গাজার এক ব্যক্তি, যিনি ইসরায়েলি হামলায় পরিবার হারিয়েছেন, তাকে পাচারকারীরা হুমকি দেয়—ফ্রান্সে ফিরে গেলে তাকে হত্যা করা হবে।
জাতিসংঘ বলছে, এসব ঘটনা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, বরং শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করছে।
কাদের ফেরত পাঠানো হবে—তা নির্ধারণেও ‘ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত’
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে—
ছোট নৌকায় আগত শরণার্থীদের মধ্যে কাকে আটক করা হবে এবং কাকে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে—এ বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। সিদ্ধান্তগুলো “ইচ্ছামতো ও অস্বচ্ছ” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর পর তাদের আবার অন্য দেশে জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়ার (refoulement) ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের সরাসরি আহ্বান: নীতি বন্ধ করুন
চিঠিতে বলা হয়েছে—
“এই চুক্তি নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে এবং বিদ্যমান দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তাই যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে অনতিবিলম্বে এই নীতি বন্ধ করতে হবে।”
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিজ্ঞতা জাতিসংঘের উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে
গার্ডিয়ানের আগের প্রতিবেদনগুলোতে দেখা গেছে—
- ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো এক ব্যক্তি পাচারকারীদের ভয়ে আবার যুক্তরাজ্যে ফিরে এসেছেন।
- আটক শরণার্থীরা তাদের ওপর হওয়া আচরণের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করলে হোম অফিসের ঠিকাদাররা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের ঢাল, টিয়ারগ্যাস ও কুকুর ব্যবহার করে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমর্থন
গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক লিটিগেশন কাউন্সিল ফর রিফিউজি রাইটসের পরিচালক বেলা মোসেলম্যান বলেন—
“জাতিসংঘের সতর্কবার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। এই নীতি মানুষকে জীবনহানির ঝুঁকি, নির্যাতন ও আইনি প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি অব্যাহত রাখা অগ্রহণযোগ্য।”
তিনি জানান, এই নীতির আওতায় শিশুরাও আটকা পড়েছে—যদিও নীতিতে শিশুদের অন্তর্ভুক্ত না করার কথা বলা হয়েছিল।
যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান
হোম অফিস বলেছে—
“এই পাইলট প্রকল্পের আইনি ভিত্তি নিয়ে আমরা আত্মবিশ্বাসী। এটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলছে।”
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) জানিয়েছে—তারা দুই দেশের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে এবং উদ্বেগগুলো সরাসরি জানানো হয়েছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো মন্তব্য দেয়নি।
যুক্তরাজ্য–ফ্রান্সের যৌথ আশ্রয় নীতি নিয়ে জাতিসংঘের এই কঠোর সতর্কবার্তা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনাই নয়, বরং দুই দেশের অভিবাসন নীতির নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতি চালু থাকলে শরণার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।