যানজটে গতি হারাচ্ছে গণপরিবহন
লন্ডনের বাস কি ধীরে ধীরে অচল হয়ে যাচ্ছে?
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৪ সেপ্টেম্বর:
লন্ডনের লাল ডাবলডেকার শুধু শহরের পরিচিত প্রতীক নয়, লাখো মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা। কিন্তু সেই বাসই এখন ক্রমেই ধীর হয়ে পড়ছে। যানজট, সড়ককাজ ও রাস্তার সীমিত জায়গার চাপে যাত্রার সময় বাড়ছে, অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে এবং যাত্রীসংখ্যাও কমছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ভুগবেন কম আয়ের মানুষ, যারা ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে লন্ডনের ৭০০টি বাস রুটের মধ্যে ৫৭৮টির গড় গতি এক দশক আগের তুলনায় কমেছে। অর্থাৎ প্রায় ৮৩ শতাংশ রুটেই বাস আগের চেয়ে ধীর হয়েছে।
লন্ডনের ব্যস্ত ২২ নম্বর বাস রুটটির পরিস্থিতি এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২৫ সালে রুটটির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৬ মাইল। ১০ বছর আগের তুলনায় এটি ১৬ শতাংশ কম। ফলে যে যাত্রা একসময় প্রায় ৫১ মিনিটে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি এখন প্রায় এক ঘণ্টা সময় নেয়।
দেখা গেছে, জুন মাসে এই রুটে অক্সফোর্ড সার্কাসে পৌঁছাতে ১০৮ মিনিটের যাত্রার মধ্যে বাসটি প্রায় ৪০ মিনিট স্থির অবস্থায় ছিল। পুটনির যানজট, বিভিন্ন সড়ক বন্ধ এবং মেফেয়ারের সড়ককাজ যাত্রাকে আরও ধীর করে দেয়।
শুধু ২২ নম্বর রুট নয়। ২০২৫ সালে ২০৭ নম্বর বাসের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ৭.৪ মাইল, যা এক দশক আগের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম। ২৪৩ নম্বর রুটের গতিও একই সময়ে ৫ শতাংশ কমেছে। এসব রুটে ২০২৫ সালে প্রায় ৯৮ লাখ যাত্রী ভ্রমণ করেছেন।
পুরো নেটওয়ার্কেই গতি কমছে
টিএফএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লন্ডনের পুরো বাস নেটওয়ার্কের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ৯.১৮ মাইল—২০১৩-১৪ সালে তুলনীয় তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে কম। এক দশকের ব্যবধানে গতি কমেছে প্রায় ৪.৮ শতাংশ।
টিএফএলের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৪-২৫ সালে গড় বাস গতি ছিল ঘণ্টায় ৯.২ মাইল, যা আগের বছরের তুলনায় আরও প্রায় ১ শতাংশ কম। সংস্থাটি জানিয়েছে, যানজট ও মহামারির পর মানুষের যাতায়াতের ধরন পরিবর্তনের কারণে বাসের গতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
গতি কমার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষার সময়ও বাড়ছে। উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির রুটে—যেখানে ঘণ্টায় পাঁচটির বেশি বাস চলে—যাত্রীরা এখন নির্ধারিত সময়ের তুলনায় গড়ে ২২ শতাংশ বেশি সময় অপেক্ষা করছেন। ২০১৮ সালে এই অতিরিক্ত অপেক্ষা ছিল ১৮ শতাংশ।
অন্যদিকে বাসযাত্রাও আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে লন্ডনে বছরে নিয়মিতভাবে ২০০ কোটির বেশি বাসযাত্রা হতো। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৮০ কোটি। ২০১৩ সালের তুলনায় বছরে বাসযাত্রা কমেছে ৩০ কোটির বেশি, বা প্রায় ১৬ শতাংশ—যদিও একই সময়ে লন্ডনের জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বেড়েছে।
বাস নেটওয়ার্কের মোট চলাচলও কমেছে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে লন্ডনের বাসগুলো বছরে গড়ে প্রায় ৪৮ কোটি ৭০ লাখ কিলোমিটার চলত। গত তিন বছরে এই পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ৪৬ কোটি কিলোমিটারে।
যানজট ও সড়ককাজ বড় কারণ
লন্ডনের বাস ধীর হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো রাস্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ। ব্যক্তিগত গাড়ি, পণ্য সরবরাহের ভ্যান, সাইকেল, ই-বাইক ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য একই সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিপুল পরিমাণ সড়ককাজ। লন্ডনের রাস্তায় গড়ে প্রতিদিন ১ হাজারের বেশি সড়ককাজ চলতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসব কাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বাস চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে।
অনলাইনে কেনাকাটা বাড়ার ফলে ডেলিভারি ভ্যানের সংখ্যাও বেড়েছে। এগুলো রাস্তার পাশে থামার কারণে বাসের জন্য নির্ধারিত জায়গা সংকুচিত হচ্ছে বলে টিএফএলের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।
সাইকেল অবকাঠামোর বিস্তার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। গত এক দশকে লন্ডনে সাইকেলওয়ের পরিমাণ প্রায় ৯০ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ৪৫০ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সাইকেলওয়েই বাস ধীর হওয়ার একমাত্র কারণ। লন্ডনের পরিবহন কর্মকর্তাদের বক্তব্য, রাস্তার জায়গা বণ্টনে পথচারী, সাইকেল আরোহী, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি—সব পক্ষের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
শুধু লন্ডন নয়, সমস্যা বৈশ্বিক
বাসের গতি কমার প্রবণতা শুধু লন্ডনের সমস্যা নয়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ট্রান্সপোর্ট স্ট্র্যাটেজি সেন্টারের ২০২৬ সালের গবেষণায় ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ১৫টি পরিবহন নেটওয়ার্কে গত এক দশকে বাসের গতি কমার ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে।
প্যারিস, ইস্তাম্বুল, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরে মহামারির আগের সময়ের তুলনায় বাসযাত্রা ১০ শতাংশেরও বেশি ধীর হয়েছে বলে ওই গবেষণায় উঠে এসেছে।
বার্সেলোনায় একটি বড় সড়ক পুনর্বিন্যাসের পর আশপাশের রাস্তায় যানজট বেড়ে বাসের যাত্রার সময় ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। নিউইয়র্কে সিক্সথ অ্যাভিনিউতে সুরক্ষিত সাইকেল লেন সম্প্রসারণের পর সকালের ব্যস্ত সময়ে বাসের গতি পরবর্তী বছরে ৮ শতাংশ কমে যায়।
সবচেয়ে বেশি চাপ নিম্নআয়ের মানুষের ওপর
বাস ধীর হয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুধু যাতায়াতের অসুবিধা নয়; এর সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নও জড়িত।
যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, যারা কম খরচে কর্মস্থলে যেতে চান কিংবা ভোর, রাত ও শিফটভিত্তিক কাজে যাতায়াত করেন—তাদের বড় অংশ বাসের ওপর নির্ভরশীল। লন্ডনে কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাসের ভাড়া পিক আওয়ারের টিউব ভাড়ার অর্ধেকেরও কম হতে পারে। আবার টিউব স্টেশনের কাছাকাছি বাড়ির ভাড়া বেশি হওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাস অনেক সময় অপরিহার্য পরিবহন হয়ে ওঠে।
এ কারণে ধীরগতি থেকে শুরু হওয়া সমস্যা একটি বড় চক্র তৈরি করতে পারে—বাস ধীর হয়, যাত্রী কমে, যাত্রী কমলে পরিষেবা কমানোর চাপ তৈরি হয়, আর পরিষেবা কমলে আরও মানুষ বাস ব্যবহার ছেড়ে দিতে পারেন।
পরিবহন খাতের ভাষায় এটিকে ‘অবনতির দুষ্টচক্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে লন্ডনের বাস নেটওয়ার্ক পুরোপুরি সংকটের দিকে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তও এখনই টানা যাচ্ছে না। টিএফএল বলছে, বাস এখনও রাজধানীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং কম খরচে মানুষকে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বায়ুদূষণ কমাতেও এর ভূমিকা রয়েছে।
বাসের গতি বাড়াতে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাকে আধুনিক করা, বাসকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সড়ককাজের সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। টিএফএলের ‘ফিউশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে লন্ডনের হাজার হাজার ট্রাফিক সিগন্যালকে আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে ২০২৫ সালে চালু হওয়া সিলভারটাউন টানেল এলাকায় যানজট কমার পাশাপাশি বাসযাত্রাও বেড়েছে বলে টিএফএলের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ব্ল্যাকওয়াল ও সিলভারটাউন টানেল দিয়ে বাসযাত্রা ২৯০ শতাংশ বেড়েছে।
লন্ডনের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু বাস কত দ্রুত চলছে—তা নয়। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের অন্যতম বড় শহরে গণপরিবহন কি এমনভাবে পরিচালিত হবে যাতে কম আয়ের মানুষও সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্যভাবে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারেন।
কারণ বাস ধীর হওয়ার সমস্যা শেষ পর্যন্ত শুধু একটি যানবাহনের গতি কমার সমস্যা নয়; এটি শহরের কাজ, আয়, সময়, পরিবেশ এবং সামাজিক সুযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।