‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৫ ।। আকাশ আর মাটি
।। আকাশ আর মাটি ।।
উৎসর্গ :
“এই গল্প সেইসব মেহনতি মানুষের প্রতি,
যারা মাটিতে দাঁড়িয়ে অন্যের আকাশ তৈরি করে।”

রহিমের কারখানা তিন দিন ধরে বন্ধ।
গ্যাস নেই। বিদ্যুৎ নেই। মেশিন নেই। শুধু গেটের সামনে কয়েকজন শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছে। কারও হাতে কাজ নেই, কিন্তু সবার ঘরে খরচ আছে।
জামাল মোবাইলে খবর পড়ছিল।
হঠাৎ হেসে উঠল সে।
—কী হয়েছে?
রহিম জানতে চাইলে জামাল বলল,
—দেশের আকাশ নাকি আরও সুন্দর হতে যাচ্ছে!
—কীভাবে?
—নতুন বিমান আসছে। আমেরিকা থেকে, ইউরোপ থেকে। আবার চীন থেকেও যুদ্ধবিমান!
রহিম মাথা চুলকে বলল,
—ভালোই তো। আমাদের পেটে ভাত না থাকলেও আকাশের পেটে বিমান থাকবে।
পাশ থেকে করিম মিয়া হেসে উঠল।
—বিমান পুরোনো হয়ে গেছে বুঝলি! এখন ধনীদের নতুন বিমান লাগবে।
জামাল বলল,
—কিন্তু ভাই, বিমান তো যাত্রী বহন করে। দেশের মানুষ বিদেশে যাবে।
করিম মিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—কোন মানুষ?
—মানুষ মানে মানুষ!
—ওহ! বুঝেছি। আমরা যে মানুষ—সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম।
সবাই হেসে উঠল।
করিম মিয়া এবার বলল,
—আকাশের মানুষদের কথা বলছি। যাদের সর্দি হলেও নাকি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া যেতে হয়। একটু পেট ব্যথা হলে ব্যাংকক। বড় অসুখ হলে লন্ডন-আমেরিকা। আর আমাদের অসুখ হলে ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হয়—ভাই, দশ টাকার ওষুধে কাজ হবে?
রহিম হাসল।
—তুই তো অনেক কিছু জানিস!
—জানি না রে। নিজের জীবন দেখেই শিখেছি।
জামাল আবার খবরের দিকে তাকাল।
—শুনলাম চীন থেকে যুদ্ধবিমানও আসবে।
করিম মিয়া এবার গম্ভীর মুখে বলল,
—যুদ্ধবিমান আসবেই।
—কিন্তু কেন?
—আকাশে যারা থাকে, তাদের তো আকাশ পাহারা দিতে হবে!
—কাদের থেকে?
করিম মিয়া চোখ টিপে বলল,
—আমাদের থেকে।
সবাই আবার হেসে উঠল।
রহিম বলল,
—তা যুদ্ধবিমান দিয়ে কী করবে? কোন্ দেশের সাথে যুদ্ধ করেতে যাচ্ছি আমরা?
করিম মিয়া বলল,
—কে জানে! হয়তো আমাদের মতো মানুষ যেন আকাশের দিকে বেশি না তাকায়, সেই পাহারা দেবে।
হাসির শব্দটা এবার ধীরে ধীরে থেমে গেল।
কারখানার গেটের ওপাশে বিশাল মেশিনগুলো দাঁড়িয়ে আছে। কাজ নেই বলে মেশিনও যেন ক্লান্ত।
রহিমের পকেটে ফোন কাঁপল।
স্ত্রীর মেসেজ—
‘চাল শেষ। মেয়ের স্কুলের বেতন বাকি। বাড়িওয়ালা আজ আবার এসেছে।এদিকে গ্রামে মাকে কিছু টাকা পাঠাতে হবে। ’
রহিম ফোনটা পকেটে রেখে আকাশের দিকে তাকাল।
একটা বিমান উড়ে যাচ্ছিল।
জামাল বলল,
—ওই বিমানে চড়ে কারা যায় জানিস?
রহিম বলল,
—আমাদের মতো মানুষও যায়।
করিম মিয়া হেসে বলল,
—হ্যাঁ, যায়। স্বপ্নে।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর করিম মিয়া বলল,
—আমরা মাটির মানুষ। মাটিতে দাঁড়িয়ে ধান ফলাই, কারখানায় কাজ করি, রিকশা চালাই, দোকানে বসি, বিদেশে গিয়ে টাকা পাঠাই। আমাদের ঘাম দিয়ে দেশের মাটি ভিজে।
—আর আকাশের মানুষ?
রহিম জিজ্ঞেস করল।
করিম মিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—তারা আমাদের ঘামের টাকায় বিমান কেনে। তারপর সেই বিমানে চড়ে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়।
জামাল মৃদু হেসে বলল,
—তাহলে আমাদের জন্য কী থাকবে?
করিম মিয়া বলল,
—মাটি।
—শুধু মাটি?
—হ্যাঁ। মাটি, ধুলো, গ্যাসের লাইন, লোডশেডিং আর মাসের শেষে ধার।
ঠিক তখন কারখানার ম্যানেজার এসে জানাল,
—আগামী সপ্তাহেও গ্যাসের ব্যবস্থা না হলে কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শ্রমিকদের অনেককেই ছাঁটাই করতে হবে।
রহিমের মুখ শুকিয়ে গেল।
করিম মিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—দেখেছিস? ওরা নতুন বিমান কিনছে, আর আমরা পুরোনো চাকরি বাঁচানোর জন্য লড়ছি।
জামাল বলল,
—একদিন কি আমাদেরও আকাশ হবে?
করিম মিয়া এবার হাসল না।
বলল,
—আকাশ সবার। কিন্তু আকাশে উঠতে সবার একই সিঁড়ি নেই।
রহিম বলল,
—তাহলে সিঁড়িটা কে বানাবে?
করিম মিয়া মাটিতে পড়ে থাকা একটি পাথর তুলে হাতে নিল।
—যারা মাটিতে থাকে, তারাই।
আকাশে তখন আরেকটি বিমান উড়ছিল।
তার ভেতরে হয়তো কেউ লন্ডন যাচ্ছে, কেউ সিঙ্গাপুর, কেউ নিউইয়র্ক। কারও হাতে ব্যবসার ফাইল, কারও হাতে চিকিৎসার রিপোর্ট, কারও হাতে বিদেশি শপিংয়ের তালিকা।
আর নিচে মাটিতে দাঁড়িয়ে রহিম হিসাব করছিল—
আজ রাতে চাল কিনবে, নাকি মেয়ের স্কুলের বেতন দেবে?
একই দেশের দুই পৃথিবী।
একদল আকাশে উঠছে।
আরেকদল মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই আকাশের দাম দিচ্ছে।
তবু মাটির মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কারণ তারা জানে—
বিমান যত দামি হোক, তার চাকা শেষ পর্যন্ত মাটিতেই নামে।
আর মাটির মানুষ?
তারা পড়ে গেলে ওঠে।
কারণ তাদের উঠে দাঁড়ানোর জন্য আকাশের দরকার হয় না।
তাদের দরকার শুধু একটু জায়গা—এই মাটিতে।
লন্ডন, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬