তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

দেশে অপরাধ কমছে পুলিশের হিসাবে, নিরাপত্তাহীনতা কাটছে না মানুষের

দেশে অপরাধ কমছে পুলিশের হিসাবে, নিরাপত্তাহীনতা কাটছে না মানুষের

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৪ সেপ্টেম্বর:

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে—পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের তুলনায় খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে। তবে একই সময়ে ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি, দস্যুতা এবং একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এক নজরে অপরাধের পরিসংখ্যান

অপরাধ ২০২৫ জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ জানুয়ারি-আগস্ট পরিবর্তন
খুন ২,৬০৭ ২,৩৩২ ২৭৫টি কম
নারী ও শিশু নির্যাতন ১১,২৬৯ ৯,৩৪৭ ১,৯২২টি কম
ধর্ষণ ৪,৬৬৬ ৪,৪৭২ ১৯৪টি কম
মব সহিংসতা ৮৯ ৫৬ ৩৩টি কম
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা ৯৯৯ ১৬৩ ৮৩৬টি কম

পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশনস শাখা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধার, বিশেষ অভিযান, চাঁদাবাজ ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং অবৈধ অস্ত্র ও পুলিশের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি এসেছে।

তবে পরিসংখ্যানের বাইরে মানুষের নিরাপত্তাবোধের চিত্র ভিন্ন। চলতি বছরে বেশ কিছু ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ৮ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক পরিবারের পাঁচজন খুন, ১৯ মে পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা হত্যা, ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশু ফারিয়াকে ধর্ষণ, ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা এবং ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় স্বপন দাশগুপ্ত ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশগুপ্ত হত্যা—এসব ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

এরপর ২ আগস্ট ময়মনসিংহে কাস্টমস কর্মী রাকিব রায়হান তালুকদারের টুকরো টুকরো লাশ উদ্ধার, ১২ আগস্ট সিলেটে ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা হত্যা, ২ সেপ্টেম্বর আদাবরে এক ব্যক্তির ১০ টুকরা লাশ উদ্ধার এবং ১২ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের মধুখালীতে ছয় টুকরা লাশ উদ্ধার মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়ায়।

সেপ্টেম্বরেও থামেনি আতঙ্ক। ১৬ সেপ্টেম্বর পাবনায় ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলি হত্যা এবং ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই দিনে খুলনায় ‘ভাত চুরি করে খাওয়া’র অভিযোগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১১ এপ্রিল কুমিল্লায় সহকারী কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডও আলোচনায় আসে।

ছিনতাই ও দস্যুতার পরিসংখ্যান

ডাকাতির মামলা, জানুয়ারি-জুন ২০২৬: ২৬৪টি
দস্যুতার মামলা, জানুয়ারি-জুন ২০২৬: ৯০৭টি

ছিনতাইয়ের ঘটনাও মানুষের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ২৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে বগুড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিনের মৃত্যু হয়। ৪ সেপ্টেম্বর টাকা ছিনতাইয়ের পর ইসমাইল নামে এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করে লাশ এক্সপ্রেসওয়েতে ফেলে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ৯ আগস্ট উত্তরায় একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি ছিনতাই এবং ৩১ আগস্ট ধানমন্ডিতে ব্যাংক থেকে ৩৯ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার সময় মোটরসাইকেলে এসে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এর মধ্যে ৫ সেপ্টেম্বর সাভারে পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা এবং একই দিনে রাজধানীর শনিরআখড়ায় ব্যবসায়ী আসমান খানকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনাও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।

মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনতাই, চুরি, সিঁধেল চুরি, চাঁদাবাজি এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করে চাঁদাবাজির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। সাইবার অপরাধ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

পুলিশের মুখপাত্র এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেছেন, পরিসংখ্যানগত দিকটি বাস্তবতা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়ায় মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হচ্ছে। পুলিশের তুলনামূলক পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির কথাই বলছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুতর অপরাধের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

অন্যদিকে সামাজিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অপরাধের সংখ্যা কমলেই মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসে না। অপরাধের ভয়াবহতা, দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং বিচার নিশ্চিত করার ওপরও মানুষের আস্থা নির্ভর করে।

সব মিলিয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে। আবার একই সময়ে ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও নৃশংস অপরাধের দৃশ্যমান ঘটনাগুলো মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।

অপরাধের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে যদি মানুষের ভয়ও কমে এবং রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরে আসে, তখনই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।