কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৫ ।। ১২ ফেব্রুয়ারি: ক্ষমতার পালাবদল নয়, জনগণের প্রত্যাশার পরীক্ষা
উৎসর্গ
“৫০ লাখ প্রথমবারের ভোটারকে—যারা ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন।”

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এই তারিখটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে দেশটি আবারও একটি সন্ধিক্ষণে। এটি কেবল আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়; এটি দীর্ঘ অস্থিরতা, বর্জন, নিষেধাজ্ঞা ও একদলীয় আধিপত্যের পর জনগণের সামনে নতুন করে পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—ব্যালটে নেই আওয়ামী লীগ। ফলে বহু বছর পর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঠে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বাস্তবতায় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন মূলত বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। যে দলই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করুক না কেন, একটি বিষয় নিয়ে প্রায় সবাই একমত—জনগণ আর সংঘাত নয়, চায় শান্তি।
এদেশে প্রতিটি নির্বাচন বয়ে আনে অতীতের স্মৃতি, ক্ষত, আশা আর ভয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং বলা যায়, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসে এই নির্বাচনটি ইতিহাসের ভার সবচেয়ে বেশি কাঁধে নিয়েই হাজির হয়েছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম, সেই রাষ্ট্র খুব দ্রুতই গণতান্ত্রিক স্বপ্নের পথ হারায়। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নেতা হলেও একদলীয় শাসনের পথে হাঁটেন। ১৯৭৫ সালের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো রাষ্ট্রকেই ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এরপর শুরু হয় সামরিক হস্তক্ষেপের যুগ—জিয়াউর রহমান, তারপর এরশাদ। গণতন্ত্র তখন কেবল একটি শব্দ, বাস্তবতা নয়।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের পতন বাংলাদেশকে নতুন আশার মুখ দেখিয়েছিল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর প্রায় দুই দশক আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে ক্ষমতায় আসে—১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা, ২০০১ সালে আবার খালেদা জিয়া, ২০০৯ সালে পুনরায় হাসিনা।
এই পালাবদলের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—ক্ষমতা বদলালেও প্রতিহিংসার রাজনীতি বদলায়নি। প্রতিটি সরকারই রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিরোধী দল মানেই রাষ্ট্রের শত্রু—এই ধারণা ধীরে ধীরে রাজনীতির স্থায়ী চরিত্রে পরিণত হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস জয় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। অর্থনীতি বাড়ে, অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়, কিন্তু একই সঙ্গে সংকুচিত হয় রাজনীতির পরিসর। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে, ২০১৮ সালে অংশ নিলেও ফলাফল নিয়ে দেশ-বিদেশে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ২০২৪ সালের নির্বাচনও বর্জনের মধ্য দিয়ে হয়। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ কার্যত একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলে—যার পতন ঘটে ২০২৪ সালের যুববিদ্রোহে।
এই প্রেক্ষাপটেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। এবার ব্যালটে নেই আওয়ামী লীগ—যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক বড় ছেদ। রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে দুটি শক্তি—বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এই দলগুলোর সামনে এখন রাষ্ট্র পরিচালনার সম্ভাবনা বাস্তব হয়ে উঠেছে।
কিন্তু জনগণ এবার আর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।
বাংলাদেশ আজ ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশ। জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ—যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছে। এরা অতীতের রাজনৈতিক প্রতিশোধের রাজনীতি দেখেনি, দেখেছে অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়। তাদের প্রত্যাশা খুব আদর্শিক নয়, খুব বাস্তব—নিরাপদ জীবন, কাজের সুযোগ, ন্যায্যতা।
গত এক দশকে দেশের অর্থনীতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বৈষম্য ও চাপ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে, মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে। রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমেনি, কিন্তু আস্থা কমেছে। মানুষ দেখেছে—ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু সাধারণ জীবনের দুশ্চিন্তা বদলায় না। এই ক্লান্তি থেকেই জন্ম নিয়েছে একটি মৌলিক চাওয়া: স্থিতিশীলতা।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে যদি বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসে, জনগণের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট কিছু বিষয়ে কেন্দ্রীভূত হবে।
প্রথমত, শান্তি ও নিরাপত্তা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দমন-পীড়ন, মামলা ও গ্রেপ্তারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। মানুষ চায় না নতুন সরকার পুরোনো হিসাব মেলাতে ব্যস্ত হোক। তারা চায় রাস্তায়, বাজারে, কর্মক্ষেত্রে স্বস্তি।
দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন। ক্ষমতায় আসা মানেই আইন নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগ—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিরোধী কণ্ঠকে শত্রু হিসেবে না দেখে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়াই হবে বড় পরীক্ষা।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক স্বস্তি। কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ছোট ব্যবসা ও মধ্যবিত্তের চাপ কমানো—এসব এখন রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়েও জরুরি বাস্তবতা। তরুণ ভোটাররা আদর্শ নয়, ফলাফল দেখতে চায়।
চতুর্থত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন—এসবকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি শুধু মুখের কথা হলে চলবে না। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধার করা ছাড়া ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সহনশীল রাজনীতি। বাংলাদেশ বহুবার দেখেছে—এক দল ক্ষমতায় এলে আরেক দল রাজপথের বাইরে চলে যায়। এই চক্র ভাঙতে না পারলে যে সরকারই আসুক, সংকট থেকেই যাবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই কেবল কে জিতবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে না। এটি দেখাবে—নতুন নেতৃত্ব কি পুরোনো অভ্যাস ভাঙতে পারে, নাকি ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে সেই অভ্যাসই ফিরে আসে।
ক্ষমতায় আসা সহজ, কিন্তু আস্থা অর্জন কঠিন। আর আস্থা ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। জনগণ এবার খুব বড় কিছু চাইছে না। তারা চায়—শান্তিতে বাঁচতে, সম্মান নিয়ে কথা বলতে, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় না পেতে।
যে দলই সরকার গঠন করুক, এই সাধারণ চাওয়াগুলোই হবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মনে রাখে না কে, কত ভোট পেয়েছিল—ইতিহাস মনে রাখে, জনগণ কাকে বিশ্বাস করতে পেরেছিল।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ৯ ফেব্রূযারি ২০২৬