ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
পদ্মা সেতু রেলপথে বড় নিরাপত্তা শঙ্কা, অচল ৭০ শতাংশ সিগন্যাল
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৩ আগস্ট: পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রেল যোগাযোগ বাড়ছে। নতুন ট্রেন চালুর প্রস্তুতির মধ্যেই এই আধুনিক রেলপথের নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় উদ্বেগ। চুরি হয়ে গেছে সিগন্যাল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও কেবল। এতে প্রযুক্তিনির্ভর সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রায় ৭০ শতাংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
ফলে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ও ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফোনে যোগাযোগ এবং চালকদের লিখিত নির্দেশনার মাধ্যমে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
পদ্মা সেতু রেলসংযোগের মাওয়া, শ্রীনগর ও নিমতলা স্টেশন এলাকায় আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় এ সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট। একাধিক দফায় দ্রুতগতির ট্রেন নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম, কেবলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ চুরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ইন্টারলকিং ও স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাতেও।
মাওয়া রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চারটি লাইনের মধ্যে বর্তমানে দুটি লাইন ব্যবহার করে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সিগন্যাল ব্যবস্থার বড় অংশ অচল থাকায় ট্রেন পরিচালনায় অতিরিক্ত সতর্কতা নিতে হচ্ছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু রেলপথের বিভিন্ন এলাকায় চুরির ঘটনা ঘটেছে। চুরি ঠেকাতে সিগন্যাল সরঞ্জামের চারপাশে নিরাপত্তা খাঁচা বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে চুরি যাওয়া যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের কাজও চলছে।
তবে নতুন ট্রেন চালুর আগে এ সংকট পুরোপুরি কাটবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
গত ১০ আগস্ট ঢাকা-পদ্মা সেতু-গোপালগঞ্জ রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ নামে নতুন এক জোড়া ট্রেন চালু হয়। আট কোচের ট্রেনটিতে আছে ৬০৯টি আসন। ঢাকা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টায় ছেড়ে ট্রেনটি গোপালগঞ্জে পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে। ফেরার পথে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে গোপালগঞ্জ ছাড়বে এবং ঢাকায় পৌঁছাবে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে।
নতুন ট্রেন যুক্ত হওয়ায় যাত্রী ও ট্রেনের চাপ আরও বাড়লো। কিন্তু সেই তুলনায় সিগন্যাল ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেল কর্মকর্তারা বলছেন, সিগন্যাল ব্যবস্থা কেবল ট্রেন চলাচলের নির্দেশনা দেয় না; এটি সংঘর্ষসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তাই গুরুত্বপূর্ণ কোনো সরঞ্জাম অচল থাকলে পুরো রেল পরিচালন ব্যবস্থাতেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শুধু প্রযুক্তিগত সংকট নয়, পদ্মা রেলসংযোগের আশপাশে জননিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মুন্সিগঞ্জে গত দুই বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে অন্তত আটজনের মৃত্যু এবং একজনের আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এ সময়ে মোট নয়টি দুর্ঘটনার কথাও জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাওয়া, শ্রীনগর ও নিমতলা এলাকায় রেললাইনের আশপাশে মানুষের অবাধ চলাচল রয়েছে। পর্যাপ্ত নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
রেলওয়ে জানিয়েছে, সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরি বন্ধ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন ট্রেন চালুর সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই রেলপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।