ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
দালাল ছাড়া সরকারি সেবা কেন সহজ হয় না, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর কন্যার
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৩ আগস্ট: বাংলাদেশে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কেন নাগরিককে অনেক সময় দালালের আশ্রয় নিতে হয়—এ প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীকন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। নিজের দ্বিতীয়বার ড্রাইভিং টেস্ট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি সড়ক নিরাপত্তা, বিআরটিএর সেবা, আইন প্রয়োগ এবং সরকারি ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছেন।
বুধবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে জাইমা রহমান জানান, জীবনের দ্বিতীয় ড্রাইভিং টেস্ট তিনি বাংলাদেশে দিয়েছেন। এর আগে এক দশকেরও বেশি সময় আগে লন্ডনে প্রথম ড্রাইভিং টেস্ট দিয়েছিলেন। দুই ক্ষেত্রেই তিনি প্রথমবারে উত্তীর্ণ হলেও দুই দেশের পরীক্ষার অভিজ্ঞতা তাকে ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে বলে জানান।
জাইমার মতে, বাংলাদেশে নতুন চালক হিসেবে নিয়ম মেনে চলতে গেলেই নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন—নিয়মগুলো সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য কি না, সঠিক পদ্ধতি কী, অনলাইন সেবা কেন সবসময় সমস্যার সমাধান করতে পারে না এবং দালালের মাধ্যমে কাজ করালে কেন তা দ্রুত হয়ে যায়।
তিনি বলেন, বিআরটিএর অনেক সেবা ডিজিটাল হওয়া ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে অনলাইনে শুরু করা কোনো কাজের সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত যদি নাগরিককে অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করতে হয়, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
জাইমা মনে করেন, সরকারি প্রক্রিয়ার জটিলতা ও অস্বচ্ছতার সুযোগেই মধ্যস্থতাকারী বা দালালদের প্রভাব বাড়ে। মানুষের আইন ভাঙার আগ্রহ থেকে নয়, বরং সরকারি সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়ায় অনেকের কাছে দালালই সহজ পথ হয়ে ওঠে। এর ফলে দুর্নীতি ধীরে ধীরে ব্যতিক্রমের বদলে স্বাভাবিক ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সড়ক ব্যবস্থাপনাতেও একই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকা, দখল বা হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া ফুটপাত এবং বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির বিশৃঙ্খল চলাচলের কথা তুলে ধরেন তিনি।
যাত্রীদের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা অনেকাংশে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মন্তব্য করেন জাইমা। বাসের চালকের আচরণ, গাড়ির যান্ত্রিক ফিটনেস কিংবা চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে একজন যাত্রীর কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সমতার প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার বক্তব্য, লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, চালকের প্রশিক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর নিয়ম থাকলেও সেগুলো যদি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়।
জাইমা ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথাও স্মরণ করেন। ওই সময় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছিল। আট বছর পরও সেই সময়ের অনেক উদ্বেগ রয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তাঁর মতে, এখন শুধু ‘সড়ক নিরাপদ নয়’ বলা যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—সমস্যাগুলো বহু বছর আগে চিহ্নিত হওয়ার পরও সেগুলোর সমাধান কেন হয়নি।
জাইমা বলেন, নাগরিককে কীভাবে নিয়ম মানানো যায়—শুধু এই প্রশ্নে আটকে না থেকে নিশ্চিত করতে হবে, পরিচিত বা প্রভাবশালী কাউকে না ধরেও যেন প্রত্যেক নাগরিক সমান সরকারি সেবা পান। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি এবং এমন সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি, যেখানে সাধারণ একটি ভুলও মানুষের জীবন কেড়ে না নেয়।
পরিবর্তন আনতে হলে শুধু নিয়ম পরিবর্তন নয়, সরকারি সেবা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রচলিত চিন্তার কাঠামোও বদলাতে হবে বলে মন্তব্য করেন জাইমা।