ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
মৃত্যুদণ্ডের আসামি, অথচ তিনি সেই সোনা মিয়াই নন
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৩ আগস্ট:
কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঘিরে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আদালতের রায়ে ‘সোনা মিয়া’ নামে যে ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কারাগারে থাকা বর্তমান সোনা মিয়া দাবি করছেন—তিনি ওই মামলার আসামিই নন। পুলিশের তদন্তেও তার দাবির সত্যতা উঠে এসেছে।
২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর গ্রেফতার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ একই ব্যক্তি নন বলে জানিয়েছে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আদালতের নির্দেশে দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একজনের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্তের পর্যায়ে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই ‘সোনা মিয়া’ নামে মামলার বিচার কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
ঘটনার শুরু ২০২০ সালের ২ মার্চ। সেদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে সোনা মিয়ার নাম, পিতা নজির আহমদ এবং কক্সবাজার পৌরসভার কুতুবদিয়াপাড়ার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয় রামুর গর্জনিয়া।
তবে তদন্তে গিয়ে বিপাকে পড়েন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক মানস বড়ুয়া উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালিয়েও তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এরপরও মামলার বিচার থেমে থাকেনি। নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলার পাঁচ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব ‘সোনা মিয়া’ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার পর তিনি জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, ২০২০ সালের ইয়াবা মামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং তিনি সেই মামলার আসামি নন।
বিষয়টি জানতে পেরে জেল সুপার আদালতকে অবহিত করেন। এরপর আদালত ঘটনার সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ।
পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ ধরা পড়া ব্যক্তি এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া আলাদা ব্যক্তি। তদন্তে আরও জানা যায়, ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ওই ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান এবং তিনি অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন।
বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তার স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়িত ছিলেন না। এমনকি তিনি আগে কখনো কারাগারেও যাননি। র্যাব তাকে গ্রেফতার করার পরই তারা জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় তার স্বামীর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
তার ভাষ্য, তার স্বামী রামুর বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গা নন। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। ওই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিল বলে তারা জানতেন।
ঘটনাটি এখন শুধু একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ভুল আসামি করার অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে মামলার তদন্ত, আসামির পরিচয় যাচাই এবং জামিন দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েও।
কারণ, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই যখন উল্লেখ করেছিলেন যে ‘সোনা মিয়া’র নাম-ঠিকানা সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি, তখন সেই পরিচয়ে একজন কীভাবে আদালতে জামিন পেলেন এবং পরে একই পরিচয়ে আরেকজনকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে পাঠানো হলো—এ প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নানের মতে, এ ঘটনায় তদন্তে গুরুতর গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট। কারও পরিচয় নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা নিশ্চিত করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। অন্যের জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে কেউ পরিচয় গোপন করলে প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত না করে মামলার তদন্ত শেষ করা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
একজনের পরিচয় অন্যের নামে, একজনের অপরাধে আরেকজনের মৃত্যুদণ্ড—কক্সবাজারের এই ঘটনা এখন দেশের বিচারব্যবস্থায় আসামির পরিচয় যাচাই ও তদন্তের মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে।