ব্রিটেন সংবাদ
ইমিগ্রেশন নীতিতে বড় পরিবর্তনের পথে ব্রিটেন
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ সেপ্টেম্বর :
ব্রিটেনের অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। ভিসা আবেদনের সিদ্ধান্তের সময় থেকে শুরু করে স্থায়ী বসবাস, নাগরিকত্ব, আশ্রয়প্রার্থী এবং বৈধ অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ অধিকার—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে ব্রিটেনে বসবাসরত এবং ব্রিটেনে আসার পরিকল্পনাকারী বাংলাদেশিদের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ সরকার Immigration Rules-এ একাধিক পরিবর্তন করেছে। ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সর্বশেষ পরিবর্তনগুলোর মধ্যে অভিবাসন আইন ভঙ্গের বিষয়টি স্পষ্ট করা, Skilled Worker ব্যবস্থায় আধুনিক দাসত্বের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা, পারিবারিক প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার আবেদনের ফি বাতিল, EU Settlement Scheme এবং Hong Kong British National (Overseas) ব্যবস্থায় পরিবর্তন রয়েছে।
ভিসার সিদ্ধান্তের সময়ও নজরে
বাংলাদেশসহ ব্রিটেনের বাইরে থেকে যারা ভিসার আবেদন করছেন, তাদের জন্য ৯ সেপ্টেম্বর GOV.UK ভিসা প্রসেসিং-টাইম সংক্রান্ত নির্দেশনা হালনাগাদ করেছে। সরকারের বর্তমান নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভিসার সিদ্ধান্ত পাওয়ার আগে ভ্রমণের টিকিট বুক না করাই উচিত। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগলে সেই অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয়ের দায় UK Visas and Immigration নেবে না।
কোন ভিসায় কত সময় লাগবে, তা এক নয়। ভিসার ধরন অনুযায়ী সময় আলাদা। উদাহরণ হিসেবে Skilled Worker, Student এবং বেশ কিছু অন্যান্য রুটে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের সিদ্ধান্ত-সময়সীমা রয়েছে। আবেদন সম্পূর্ণ করার পর পরিচয় যাচাই, বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার পর থেকেই মূল প্রসেসিং সময় গণনা করা হয়।
অর্থাৎ ভিসা আবেদন করার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত না এলে সেটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত নথি বা যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে সময় আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের প্রশ্ন—স্থায়ী বসবাস
ব্রিটেনে দীর্ঘদিন বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য আরও বড় বিষয় হচ্ছে Indefinite Leave to Remain বা ILR।
সরকারের প্রস্তাবিত ‘earned settlement’ ব্যবস্থায় অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের সাধারণ যোগ্যতার সময় পাঁচ বছর থেকে ১০ বছর করার পরিকল্পনা সামনে এসেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Migration Observatory-ও জানিয়েছে, সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে এমন পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি সব ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কার্যকর আইন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। স্থায়ী বসবাসের নিয়ম বিভিন্ন রুটে ভিন্ন এবং প্রস্তাবিত সংস্কারের কোন অংশ কখন এবং কার ওপর প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে এখনও রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক রয়েছে।
হাউস অব লর্ডসের Justice and Home Affairs Committee-ও প্রস্তাবিত ১০ বছর বা তার বেশি সময়ের settlement ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং অতীতে শুরু করা অভিবাসীদের ওপর নতুন নিয়ম পেছন থেকে প্রয়োগ করা হলে তা অন্যায্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
আশ্রয় ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন
ব্রিটেনের আশ্রয় ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের ২ মার্চ থেকে নতুনভাবে আশ্রয়প্রার্থীদের দেওয়া refugee protection স্থায়ী হওয়ার পরিবর্তে সাময়িক হবে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতি ৩০ মাস পরপর সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করার ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, এর মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে শরণার্থী ও তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশি ব্রিটিশদের জন্য এর অর্থ কী?
ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নতুন নিয়মগুলো তাদের বর্তমান বা ভবিষ্যৎ অভিবাসন অবস্থাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে।
যারা Skilled Worker ভিসায় আছেন, তারা ভবিষ্যতে ILR-এর যোগ্যতার সময় নিয়ে উদ্বিগ্ন। যারা পরিবার নিয়ে ব্রিটেনে বসবাস করছেন, তাদের জন্য settlement ও citizenship-এর নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। আর যারা বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে পড়াশোনা বা চাকরির জন্য আসতে চান, তাদের জন্য ভিসা পাওয়া, আবেদন প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তের সময় এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্যের মধ্যে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—প্রস্তাবিত নীতি, সংসদে আলোচিত পরিবর্তন এবং বর্তমানে কার্যকর Immigration Rules এক জিনিস নয়।
কোনো অভিবাসী নিজের ভিসা বা ILR-এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সর্বশেষ GOV.UK নির্দেশনা দেখা উচিত।
শুধু ভিসা নয়, বদলে যাচ্ছে পুরো অভিবাসন দর্শন
ব্রিটেনের বর্তমান অভিবাসন সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সরকার শুধু কতজন মানুষ দেশে প্রবেশ করছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে না; বরং কে কতদিন ব্রিটেনে থাকবে, কখন স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাবে এবং কীভাবে নাগরিকত্বের যোগ্য হবে—সেই কাঠামোকেও নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে।
একদিকে সরকার বৈধ ও দক্ষ অভিবাসন চালু রাখতে চায়, অন্যদিকে অবৈধ প্রবেশ, আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনের সংখ্যা কমানোর রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। ফলে ব্রিটেনের ইমিগ্রেশন নীতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর ও শর্তনির্ভর হওয়ার দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য তাই বিষয়টি শুধু নতুন ভিসা আবেদনকারীদের সমস্যা নয়। ব্রিটেনে বহু বছর ধরে বসবাসরত পরিবার, নতুন প্রজন্ম, শিক্ষার্থী, কর্মী এবং ভবিষ্যতে ব্রিটেনে আসতে আগ্রহী সবাইকে এই পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে।
ব্রিটেনের অভিবাসন নীতির পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের গল্প নয়—এটি ব্রিটেনে বসবাসরত লাখ লাখ অভিবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন এখন একটাই—ব্রিটেন কি অভিবাসন কমাবে, নাকি অভিবাসনের পুরো কাঠামোটিই নতুন করে লিখবে?