বাংলাদেশ সংবাদ

দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে, নীরবে গভীর হচ্ছে মানসিক সংকট

দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে, নীরবে গভীর হচ্ছে মানসিক সংকট

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৩ সেপ্টেম্বর: 

বাংলাদেশে আত্মহত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে। পুলিশ ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে দেশে প্রতিবছর গড়ে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০টি প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১৪ হাজার ৫৫৬ জন, ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৫০, ২০২২ সালে ১৫ হাজার ৯৮৭, ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৮৪ এবং ২০২৪ সালে ১৩ হাজার ৯২০ জন আত্মহত্যা করেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৯১। ছয় বছরে মোট সংখ্যা ৮৭ হাজারের বেশি।

তবে এই পরিসংখ্যানের বাইরেও আরও অনেক ঘটনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আত্মহত্যার সব ঘটনা একইভাবে নথিভুক্ত বা শনাক্ত হয় না।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শিক্ষার্থীদের নিয়ে

আত্মহত্যার প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করছে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১০১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করলেও ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৫৩২। ২০২৩ সালে ৫১৩, ২০২৪ সালে ৩১০ এবং ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশের বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। তাদের ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থী এবং ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পরও অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষার ফল, প্রেমের সম্পর্ক, পারিবারিক কলহ কিংবা শিক্ষকের সঙ্গে অভিমান—এসব কোনো একটি ঘটনাকে অনেক সময় আত্মহত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, হতাশা, একাকিত্ব ও অপ্রাপ্তি কাজ করতে পারে।

নারীও বেশি ঝুঁকিতে

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা যায়, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারী ৫৭ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৩ শতাংশ। তরুণদের ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আর্থিক অস্বচ্ছলতা, বেকারত্ব, ঋণের চাপ, চাকরি বা ব্যবসায় ক্ষতি, কর্মক্ষেত্রের নেতিবাচক পরিবেশ, প্রেমে ব্যর্থতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মাদকাসক্তি ও বিষণ্নতা।

পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের পাশাপাশি তাদের সন্তানরাও মানসিকভাবে ঝুঁকিতে থাকে। অল্প বয়সে বিয়ের পর নির্যাতনের শিকার নারী, তালাকপ্রাপ্ত নারী এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় থাকা কিছু প্রবাসী শ্রমিকের স্ত্রীও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

মানসিক চাপ বাড়ছে, কমছে সহনশীলতা

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. গোলাম রাব্বানীর মতে, মানুষের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে জীবন ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। ফলে মানসিক চাপও বাড়ছে। তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে অন্তত একজন আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর মতে, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা যখন দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তা কমানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকে না, তখন তার প্রভাব পরিবার, শিক্ষা ও কর্মজীবনেও পড়ে। একপর্যায়ে এই অস্থিরতা ব্যক্তির মানসিক সংকটে রূপ নেয়।

সমস্যা লুকিয়ে নয়, শনাক্ত করেই প্রতিরোধ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যাকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা আবেগের ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে না। কোথায়, কোন বয়সে এবং কী কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটছে—তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি ও বিশ্লেষণ জরুরি।

বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সংকট মোকাবিলার বিষয়ে কাজ করার পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন। শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

কারণ প্রতিদিন প্রায় ৪০টি মৃত্যু যদি শুধু একটি সংখ্যা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সংখ্যার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে ৪০টি পরিবার, ৪০টি অসমাপ্ত জীবন এবং অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ তাই শুধু মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নয়—এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।