দেশে চরম বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে টুক করে মন্তব্য করলেন বিদ্যুৎ মন্ত্রী টুকু
‘এখন আমার কিছু করার নাই’—লোডশেডিং নিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বিস্ময়কর বক্তব্য
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৪ আগস্ট:
দেশের মানুষ বিদ্যুৎ চায়, শিল্পকারখানা চায় গ্যাস, ব্যবসায়ীরা চান উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি—আর বিদ্যুৎমন্ত্রীর হাতে আপাতত আছে দুটি জিনিস: লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও দিন গোনা।
জ্বালানি সংকট নিয়ে রাজধানীতে এক সংলাপে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া তাঁর হাতে কার্যত আর কোনো পথ নেই। তাঁর ভাষায়, গ্যাস উত্তোলন করা যাচ্ছে না, আবার এফএসআরইউ সচল না থাকায় মজুত গ্যাসও জাতীয় গ্রিডে আনা যাচ্ছে না।
অর্থাৎ সংকটের সমাধান আপাতত সমাধান নয়—সমাধান আসা পর্যন্ত সংকটকে কীভাবে ভাগ করে দেওয়া যায়, সেটিই ব্যবস্থাপনার মূল কৌশল।
মন্ত্রী বলেছেন, প্রকৌশলীরা এফএসআরইউ মেরামত করছেন। তিনি meanwhile দিন গুনবেন এবং এমনভাবে লোডশেডিং করবেন, যাতে কম মানুষ একসঙ্গে বিদ্যুৎ না পাওয়ার সুযোগ পান। শিল্পে কিছুটা গ্যাস দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার এই নতুন দর্শনকে চাইলে বলা যায়—‘বিদ্যুৎ নেই, তবে ব্যবস্থাপনা আছে।’
সংকটের চিত্র অবশ্য বেশ বাস্তব। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। রপ্তানি আদেশ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তারা ব্যাংকের ঋণের কিস্তি ও শ্রমিকদের বেতন নিয়ে উদ্বিগ্ন।
অর্থাৎ কারখানায় উৎপাদন কমছে, শ্রমিকের কাজ কমছে, উদ্যোক্তার আয় কমছে—কিন্তু রাষ্ট্রের আশাবাদ কমছে না।
এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, আমদানিনির্ভরতা, সিস্টেম লস, চুরি এবং যথাযথ মূল্যনীতি না থাকার কারণে আজকের সংকট তৈরি হয়েছে। সিপিডির হিসাবে দেশের বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
সমস্যার গভীরতা বোঝাতে এত তথ্যের প্রয়োজন হয় না। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে বসে থাকলেই নাগরিক বুঝে যান—দেশের জ্বালানি নীতি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
মন্ত্রী অবশ্য ভবিষ্যতের জন্য বড় পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন একটি এফএসআরইউর অর্ডারও দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ আজকের নাগরিককে লোডশেডিং সামলাতে হবে, শিল্পপতিকে উৎপাদন সামলাতে হবে, শ্রমিককে চাকরি সামলাতে হবে—আর সবাই মিলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এর মধ্যেই ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে গ্যাস কারখানায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩০টি ট্রাক চলাচলের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কনটেইনারে গ্যাস সরবরাহের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
গ্যাস সরবরাহের ভবিষ্যৎ যেন এখন আধুনিক পাইপলাইন থেকে সরে ধীরে ধীরে ট্রাকের দিকে এগোচ্ছে। কাল হয়তো পরিস্থিতি আরও উন্নত হলে গ্যাসের জন্য ‘কুরিয়ার সার্ভিস’ চালু করতে হবে!
মন্ত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বলেছেন ‘গরিবের টেসলা’। তাঁর অভিযোগ, এসব রিকশার বড় অংশ রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগে চার্জ দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।
‘গরিবের টেসলা’ রাতের আঁধারে চার্জ নেয়—আর দেশের সাধারণ মানুষ সেই চার্জের বিল দিতে গিয়ে দিনের আলোতেও অন্ধকারে থাকে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার এই বৈপরীত্যটিই হয়তো বর্তমান সংকটের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা।
তবে বিদ্যুৎ চুরি বা অবৈধ সংযোগ যে সমস্যা, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যে ব্যবস্থায় অবৈধ সংযোগ বছরের পর বছর চলে, সেখানে শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে কর্মীরা হামলার শিকার হচ্ছেন—এটি কি কেবল নাগরিকের অপরাধ, নাকি ব্যবস্থাপনারও ব্যর্থতা?
সিপিডি জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদি নীতির কথা বলেছেন।
সব মিলিয়ে সংকটের তালিকা দীর্ঘ, সুপারিশের তালিকাও দীর্ঘ। শুধু সমাধানের তালিকাটিই যেন সবচেয়ে ছোট।
তাই আপাতত নাগরিকদের জন্য সরকারের বার্তাটি খুব সহজ: বিদ্যুৎ গেলে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা চলছে। আর দিনও গোনা হচ্ছে।