ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫০ ।। গ্যাস নেই বলে বিদ্যুৎ নেই, বিদ্যুৎ নেই বলে কারখানা বন্ধ—সমাধান? ‘দিন গোনা’

কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫০ ।। গ্যাস নেই বলে বিদ্যুৎ নেই, বিদ্যুৎ নেই বলে কারখানা বন্ধ—সমাধান? ‘দিন গোনা’

উৎসর্গ
যারা গরমের রাতে বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় ঘুমাতে পারেন না,
আর যাদের ছোট্ট কারখানার মেশিন থেমে গেলে থেমে যায় সংসারের চুলাও।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের গল্পটি কেবল লোডশেডিংয়ের গল্প নয়। এটি আসলে জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানিনির্ভরতা, দুর্বল পরিকল্পনা, শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর কাঠামোগত সংকটের গল্প।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অথচ চাহিদার সময় ১৯ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে ঘাটতি ৩ হাজার থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠেছে। ফলে গ্রাম থেকে রাজধানী—দেশের মানুষ আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নের মুখোমুখি: এত বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকার পরও বিদ্যুৎ নেই কেন? সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও ৩ হাজার ৭৫০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং এবং ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার চিত্র উঠে এসেছে।

সমস্যার উত্তরটি উৎপাদনক্ষমতায় নয়, বরং জ্বালানিতে

বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু অনেক কেন্দ্র চালানোর মতো গ্যাস নেই। গ্যাস আছে, কিন্তু এলএনজি খালাস ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট। কয়লা সরবরাহেও ঘাটতি রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে হাজার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে সেই সক্ষমতার বড় অংশ অচল বা আংশিক সচল।

আর এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং ছোট উদ্যোক্তারা।

‘দিন গোনা ছাড়া উপায় নেই’—মন্ত্রী যখন এমন কথা বলেন

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বক্তব্য বর্তমান পরিস্থিতির কঠিন বাস্তবতাটিই সামনে এনেছে।

সিপিডির আয়োজিত জ্বালানি সংকটবিষয়ক এক সংলাপে তিনি বলেছেন, এলএনজি টার্মিনাল মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত সরকারের হাতে আর কোনো উপায় নেই।

মন্ত্রীর বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই—সরকারও স্বীকার করছে, সমস্যাটি এখন কেবল বিদ্যুৎ বিতরণের নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের সংকট।

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সংকটের সূত্রপাত। একটি বড় এলএনজি সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। একই সময়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্য টার্মিনালে এলএনজি খালাসেও সমস্যা হয়েছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে গেছে।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদেশি প্রকৌশলীরা টার্মিনাল মেরামতের কাজ করছেন। কিন্তু মেরামত শেষ হওয়ার পরও নতুন বয়লার চালুর জন্য পুরো সিস্টেমকে প্রায় ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হতে পারে। অর্থাৎ সামনে আরও সাময়িক গ্যাস সংকট তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি টার্মিনালের ওপর এত বড় মাত্রায় নির্ভরশীল একটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ?

সক্ষমতা আছে, উৎপাদন নেই

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গত দেড় দশকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি। একসময় বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা। তাই একের পর এক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

আজ সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।

কিন্তু সেই সক্ষমতা এখন অনেকটা যেন তালাবদ্ধ কারখানা। যন্ত্রপাতি আছে, শ্রমিক আছে, অবকাঠামো আছে—কিন্তু কাঁচামাল নেই।

গ্যাসের অভাবে ২১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে। এর মধ্যে ১৬টি গ্যাসভিত্তিক। আরও ৩৪টি কেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন কম’ বললে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে ভয়াবহ অসামঞ্জস্য।

বিদ্যুৎ সংকট এখন অর্থনীতির সংকট

লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হয়তো অন্ধকার ঘর নয়, অচল হয়ে যাওয়া অর্থনীতি।

বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কিছুটা সামর্থ্য আছে। তারা জেনারেটর চালাতে পারে, বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারে, অতিরিক্ত খরচ বহন করতে পারে। কিন্তু দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সেই সুযোগ নেই।

পাবনার আব্দুস সালামের মতো উদ্যোক্তার ভারী মেশিন বিদ্যুৎ না থাকলে থেমে যায়। স্বাভাবিক দিনে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করা একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন সেই আয় করতে পারছেন না। অথচ শ্রমিকের বেতন বন্ধ করা যাচ্ছে না।

কেরানীগঞ্জের আবুল কাশেম টিটুর একটি প্যাকেজিং মেশিন যেখানে ৪০ দিনে তৈরি হওয়ার কথা, লোডশেডিংয়ের কারণে সেটি তৈরি করতে প্রায় দুই মাস লাগছে।

এটি শুধু একজন ব্যবসায়ীর ক্ষতি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহনকর্মী, ক্রেতা এবং ব্যাংকঋণ।

একটি ছোট কারখানা যখন উৎপাদন করতে পারে না, তখন তার মালিকের আয় কমে। শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমে। পণ্য সরবরাহ বিলম্বিত হয়। ক্রেতা অন্য দেশে চলে যেতে পারে। ব্যাংকের কিস্তি বাকি পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ লোডশেডিংয়ের প্রতিটি ঘণ্টা অর্থনীতির জন্যও একটি উৎপাদন-হ্রাসের ঘণ্টা।

১ কোটি ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন

বাংলাদেশে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং দেশের জিডিপিতে তাদের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি।

এগুলো কোনো প্রান্তিক অর্থনৈতিক খাত নয়। বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি ভিত্তি।

লেদ মেশিনের ছোট ওয়ার্কশপ, জুতার কারখানা, ওয়েল্ডিং দোকান, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ছোট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট, পাড়ার লন্ড্রি—সব মিলিয়েই তৈরি হয় একটি বিশাল অর্থনৈতিক চক্র।

বিদ্যুৎ সংকটে সেই চক্রের গতি কমে যাচ্ছে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও সতর্ক করেছেন, উৎপাদন কমে গেলে উদ্যোক্তারা পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন না; ফলে ব্যাংকঋণের কিস্তি ও অন্যান্য দায় পরিশোধের সক্ষমতাও কমবে।

এখানেই সংকটের দ্বিতীয় স্তর—বিদ্যুৎ সংকট → উৎপাদন কমে যাওয়া → আয় কমা → ঋণ পরিশোধে সমস্যা → ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি → কর্মসংস্থান কমে যাওয়া।

শিল্প খাতের সংকেত আরও ভয়ংকর

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

একটি রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

কারখানা সময়মতো পণ্য উৎপাদন করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতা অপেক্ষা করবে না। সে অন্য দেশের সরবরাহকারীর কাছে চলে যেতে পারে। একবার অর্ডার হারালে সেটি ফিরিয়ে আনা সবসময় সহজ নয়।

অর্থাৎ আজকের লোডশেডিং আগামী দিনের রপ্তানি আয় কমিয়ে দিতে পারে।

আর শিল্প উৎপাদন কমলে সরকারের রাজস্বও কমবে। কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাংকঋণের মান খারাপ হবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর বহুগুণ প্রভাব পড়বে।

আসল সংকট কি শুধু এলএনজি?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনা কি বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ?

উত্তর—না।

এটি সংকটকে তীব্র করেছে, কিন্তু সংকটের ভিত্তি আরও গভীরে।

দেশের গ্যাস উৎপাদনও কমছে। সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় দৈনিক উৎপাদন একসময় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ওপরে থাকলেও এখন তা প্রায় ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অথচ বিদ্যুৎ ও শিল্পে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে।

ফলে একটি সহজ সমীকরণ দাঁড়িয়েছে:

দেশীয় গ্যাস কমছে + এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে + ডলার ব্যয় হচ্ছে + আমদানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে।

এটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো নিরাপদ জ্বালানি কাঠামো হতে পারে না।

রাত ১২টায় কেন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে?

মন্ত্রী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন—ব্যাটারিচালিত রিকশা।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব যানবাহনের বড় অংশ রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময় বা পিক আওয়ারের চরিত্র বদলে যাচ্ছে এবং রাতেও চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে উঠছে।

এটি চাহিদা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি উদাহরণ।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোথায়, কখন এবং কীভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে—সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা হামলার শিকার হচ্ছেন—এ তথ্যও পরিস্থিতির সামাজিক জটিলতা দেখায়।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কোথায়?

সিপিডির আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে—বাংলাদেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের প্রায় ৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই চিত্রই বলে দেয়, আমাদের জ্বালানি কাঠামো কতটা একমুখী।

গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যতদিন থাকবে, ততদিন আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক মুদ্রা, পরিবহন, টার্মিনাল কিংবা ভূরাজনৈতিক কোনো সমস্যাই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

তাই সমাধান শুধু আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়।

প্রয়োজন—

  • দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো;
  • এলএনজি আমদানির উৎস ও অবকাঠামো বহুমুখী করা;
  • স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালসহ দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো তৈরি;
  • সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো;
  • ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ;
  • বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিক করা;
  • সিস্টেম লস ও অবৈধ সংযোগ কমানো;
  • শিল্পে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা;
  • এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চাহিদা ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন একটি এফএসআরইউর অর্ডারও দেওয়া হয়েছে।

এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২৯ পর্যন্ত বর্তমান অর্থনীতি কীভাবে চলবে, মানুষ কিভাবে বাঁচবে?

‘দিন গোনা’ যেন স্থায়ী নীতি না হয়

মন্ত্রী যখন বলেন, এখন ‘দিন গোনা ছাড়া’ আর উপায় নেই, তখন সেটিকে শুধু একটি তাৎক্ষণিক সংকটের বক্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

কারণ বিদ্যুৎ সংকট বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই শীতকাল ছাড়া বছরের বড় একটি সময়ে কমবেশি লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবার পার্থক্য হলো—বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে, কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয়নি।

আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েছি, কিন্তু জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারিনি।

আমরা বিদ্যুতায়ন বাড়িয়েছি, কিন্তু চাহিদা ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট শক্তিশালী করতে পারিনি।

আমরা শিল্প বাড়াতে চেয়েছি, কিন্তু শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকে কতটা অগ্রাধিকার দিয়েছি, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আজকের অন্ধকার তাই শুধু বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অন্ধকার নয়। এর মধ্যে আছে পরিকল্পনার অন্ধকার, জ্বালানি নিরাপত্তার অন্ধকার এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ শুধু আগামী কয়েক দিনের লোডশেডিং কমানো নয়। বরং এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটলেই হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন থমকে যাবে না।

কারণ বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা।

আর রক্তসঞ্চালন বারবার বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ঘর অন্ধকার হয় না, একসময় পুরো অর্থনীতিই, পুরো দেশই স্থবির ও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন,   ১৪  আগস্ট, ২০২৬