ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কুরআন গবেষণা থেকে ‘মাধ্যাকর্ষণ বিদ্যুৎ’ আবিষ্কারের দাবি, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার অপেক্ষায় সুহাইল
বিচিত্র খবর ডেস্ক, ১৪ আগস্ট:
তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা নয়—মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের দাবি করেছেন কুমিল্লার তিতাসের আবদুর রহমান সুহাইল। কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা এই তরুণের দাবি, পবিত্র কুরআন নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করতে গিয়ে তিনি এ পদ্ধতির ধারণা পান।
তবে তাঁর দাবিটি এখনো কোনো স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে সুহাইল নিজেই তাঁর উদ্ভাবনের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা চেয়েছেন।
সুহাইলের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি ভারী বস্তুকে ওপর থেকে নিচে নামানোর সময় মাধ্যাকর্ষণজনিত শক্তি ব্যবহার করে ক্রেন বা যান্ত্রিক ব্যবস্থা ঘোরানো হবে। সেই ঘূর্ণন থেকে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা তাঁর। তিনি দাবি করছেন, ব্যবস্থাটির বিশেষ নকশার কারণে ভারী বস্তুটি নিচে নামার পর আবার এমন অবস্থায় ফিরে যাবে, যাতে একই প্রক্রিয়া পুনরায় চালানো সম্ভব হয়।
সুহাইল জানান, তাঁর গবেষণার মূল ধারণা আসে ২০২২ সালের দিকে। পরবর্তী সময়ে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে একটি ডেমো প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন বলে দাবি করেন। ২০২৩ সালে ধারণাটিকে তাত্ত্বিকভাবে সফল মনে করার পর প্রায় এক বছর বিভিন্ন পরীক্ষা চালানোর কথাও তিনি জানিয়েছেন। গবেষণার খরচ জোগাতে তাঁকে দিনমজুর হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
গত ৬ জুলাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে উদ্ভাবনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলেও জানান সুহাইল। তাঁর প্রত্যাশা, সরকারের পক্ষ থেকে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে তাঁর পদ্ধতিটি পরীক্ষা করা হবে। বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পেটেন্টের ক্ষেত্রেও সরকারি সহযোগিতা চান তিনি।
মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে বিদ্যুৎ—বিজ্ঞান কী বলছে?
এখানেই রয়েছে দাবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। মাধ্যাকর্ষণকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি বাস্তবেই আছে। আধুনিক ‘গ্র্যাভিটি এনার্জি স্টোরেজ’ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ভারী বস্তু ওপরে তোলা হয়। পরে সেই বস্তু নিচে নামানোর সময় তার সঞ্চিত মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়।
কিন্তু এই ব্যবস্থাকে ‘বিনামূল্যের’ বা সীমাহীন বিদ্যুৎ উৎপাদন বলা যায় না। কারণ বস্তুটিকে আবার আগের উচ্চতায় তুলতে শক্তি দিতে হয়। ক্যালটেকের ফাইনম্যান লেকচারেও মাধ্যাকর্ষণজনিত বিভব শক্তিকে বস্তুর ওজন ও উচ্চতার সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং একই ব্যবস্থা থেকে ধারাবাহিকভাবে অতিরিক্ত শক্তি পাওয়ার ধারণাকে শক্তি সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ, সুহাইলের পদ্ধতিতে যদি সত্যিই কোনো বাহ্যিক শক্তি ছাড়াই একই ভার বারবার তার প্রাথমিক অবস্থায় ফিরে গিয়ে ক্রমাগত জেনারেটর চালাতে পারে এবং ব্যবস্থাটি যত শক্তি গ্রহণ করছে তার চেয়ে বেশি ব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপন্ন করে, তাহলে সেটি প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি হবে। এমন ফলাফল প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, পরিমাপযোগ্য তথ্য, শক্তির ইনপুট-আউটপুট হিসাব এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পুনরাবৃত্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হবে।
কুরআন থেকে আরও আবিষ্কারের দাবি
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সুহাইল সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সক্ষম একটি নিরাপত্তা সরঞ্জাম তৈরির দাবিও করেছেন। এ ছাড়া রোবোটিক কুকার, ওয়াটার বুট ও অন্যান্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তবে এসব উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও দাবির সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ফলাফলের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধারণা বা প্রোটোটাইপকে ‘আবিষ্কার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার কার্যকারিতা পরীক্ষাযোগ্য হতে হয়।
সুহাইলের ক্ষেত্রে তাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর দাবি সত্য কি না—তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং দাবিটিকে নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার আওতায় আনা। পরীক্ষায় কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে সেটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হবে। আর পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে কোথায় তাত্ত্বিক বা প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হবে।
সুহাইলের দাবি অনুযায়ী, তিনি সরকারের কাছে অর্থের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তাঁর উদ্ভাবনের নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নই চান। এখন সেই পরীক্ষাই বলে দিতে পারে—মাধ্যাকর্ষণভিত্তিক তাঁর যন্ত্রটি সত্যিই নতুন কোনো প্রযুক্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, নাকি এটি প্রচলিত ‘গ্র্যাভিটি ব্যাটারি’র ধারণার বাইরে যেতে পারেনি।