চাকরিতে ফেরার সম্ভাবনায় ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের পেছনে ফেলেছে তরুণ বেনিফিটপ্রাপ্তরা
বেনিফিটে আটকে তরুণ প্রজন্ম, যুক্তরাজ্যে কর্মসংস্থানের নতুন সংকট
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক নিউজ, ১৬ জুলাই:
যুক্তরাজ্যে কর্মসংস্থানের বাজারে নতুন এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। বেনিফিট বা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল তরুণদের একটি বড় অংশ আর সহজে চাকরিতে ফিরতে পারছেন না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কর্মসংস্থানে ফেরার ক্ষেত্রে ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণরা এখন অনেক ক্ষেত্রে ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের চেয়েও পিছিয়ে পড়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, তরুণ বয়সেই যদি দীর্ঘদিন মানুষ কর্মজীবনের বাইরে থেকে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু বর্তমান নয়, পুরো ভবিষ্যৎ জীবনেও পড়ে। আয়, দক্ষতা অর্জন, ক্যারিয়ার গঠন, বাড়ি কেনা কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তারা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মুখে পড়তে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিটেনে এখন একটি নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা, অন্যদিকে রয়েছে এমন এক তরুণ প্রজন্ম, যারা শিক্ষা শেষ করার পরও স্থায়ী চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না কিংবা দীর্ঘদিন বেকারত্বের কারণে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছে তরুণরা
একসময় তরুণ বয়সকে কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নতুন দক্ষতা শেখা, প্রথম চাকরিতে প্রবেশ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য এই সময়টিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক তরুণ দীর্ঘদিন ধরে চাকরির আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেন না। কেউ কেউ পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাবে সুযোগ হারাচ্ছেন, আবার অনেকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির কারণে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারছেন না।
সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল তরুণদের একটি অংশ ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে, যেখান থেকে কর্মজীবনে ফিরে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কেন ৫৫ বছরের বেশি বয়সীরা এগিয়ে?
অবাক করার মতো বিষয় হলো, চাকরিতে ফেরার ক্ষেত্রে অনেক ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এখন তরুণদের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর একটি বড় কারণ হলো অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে বয়স্ক কর্মীদের হাতে রয়েছে নির্দিষ্ট দক্ষতা, পেশাগত যোগাযোগ এবং কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা। ফলে তারা নতুন সুযোগ পেলে দ্রুত কাজে ফিরতে পারেন।
অন্যদিকে, তরুণদের বড় সমস্যা হলো—অনেকেরই কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নেই। প্রথম চাকরির সুযোগ না পাওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস অর্জনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
করোনা পরবর্তী পরিবর্তন ও নতুন চ্যালেঞ্জ
করোনা মহামারির পর যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তন এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কাজের ধরন পরিবর্তন করেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রবেশ পর্যায়ের চাকরির সুযোগ কমেছে।
একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং দক্ষতার পরিবর্তিত চাহিদাও তরুণদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বেনিফিট কমানো বা নিয়ম কঠোর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের’ ভয়
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—যেসব তরুণ দীর্ঘ সময় কর্মজীবনের বাইরে থাকছেন, তাদের একটি অংশ হয়তো ভবিষ্যতেও শ্রমবাজারে পুরোপুরি ফিরতে পারবেন না।
তরুণ বয়সে চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকা পরবর্তী জীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে শুধু ব্যক্তির আয় কমে না, দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের করদাতা, ভোক্তা এবং কর্মশক্তি।
যুক্তরাজ্যের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—বেনিফিটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া তরুণদের কীভাবে আবার কর্মজীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা যায়।
কারণ একটি প্রজন্ম যদি কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যায়, তার ক্ষতি শুধু সেই প্রজন্মের নয়; এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজ ও অর্থনীতির ওপর।