ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ইইউর পোশাক বাজারে মন্দা, ছয় মাসে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে ১৬.৪৩%
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৫ আগস্ট:
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে চাহিদা কমার সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন—ছয় মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলন অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে ইইউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আমদানি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ ইউরোপের বাজার যতটা সংকুচিত হয়েছে, বাংলাদেশের রফতানি কমেছে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে।
শুধু রফতানির মূল্য নয়, বাংলাদেশের পোশাকের পরিমাণ ও দাম—দুটিই কমেছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে পোশাকের গড় দাম কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ফলে কম পণ্য রফতানির পাশাপাশি কম দামেও পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের।
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। ইইউতে ছয় মাসে চীনের পোশাক রফতানি কমেছে ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ, তুরস্কের ১৪ দশমিক ৬০, ভারতের ১২ দশমিক ৪৯, পাকিস্তানের ১২ দশমিক ৫৩, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ২১ এবং কম্বোডিয়ার ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের পতন এসব দেশের বেশির ভাগের চেয়েই বেশি।
এই পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছে ভিয়েতনাম। দেশটির পোশাক রফতানির পরিমাণ ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ কমলেও মোট রফতানি মূল্য বেড়েছে ০ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এর প্রধান কারণ, তাদের পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
অর্থাৎ কম পরিমাণ পণ্য রফতানি করেও বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে ভিয়েতনাম আয় ধরে রাখতে পেরেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো—পরিমাণ ও দাম দুটোই কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের দুর্বল ভোক্তা চাহিদা, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পোশাকের অর্ডার কমেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য নেওয়ার চাপও বাড়িয়েছে।
তবে বাংলাদেশের জন্য সমস্যা শুধু বাজার সংকোচনে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে কম দামে বেশি পরিমাণ পোশাক রফতানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের সামনে এখন উচ্চমূল্যের ও বেশি মূল্য সংযোজনের পণ্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের উদ্বেগের জায়গা হলো—ইইউর বাজার যতটা সংকুচিত হয়েছে, দেশের রফতানি তার তুলনায় অনেক বেশি কমেছে। একইসঙ্গে রফতানির পরিমাণ ও ইউনিট মূল্য কমে যাওয়াকে তিনি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কম পরিমাণ পণ্য রফতানি করেও বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে দেশটি আয় ধরে রাখতে পেরেছে। তাই বাংলাদেশেরও শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর পরিবর্তে পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে হবে।
জুনে অবশ্য কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। ওই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তবে গড় দাম কমেছে ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। ফলে পরিমাণ বাড়লেও আয়ে বড় ধরনের উন্নতি হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে এখনই উচ্চমূল্যের পোশাক, সিনথেটিক ও কারিগরি পোশাক, নকশাভিত্তিক পণ্য এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতার দিকে যেতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন, জ্বালানি ও অর্থায়ন ব্যয় কমানো এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এর সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাণিজ্যসুবিধা নিয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে জিএসপি প্লাসের প্রস্তুতির পাশাপাশি ইউরোপীয় ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা এবং নতুন পণ্যে বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
জুনের সামান্য প্রবৃদ্ধি তাই আপাতত স্বস্তি দিলেও ছয় মাসে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতনকে বড় সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ইউরোপের বাজারের সংকট সাময়িক হলেও বাংলাদেশের রফতানি যদি প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় দ্রুত কমতে থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যতে বাজারের অংশীদারত্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এখন মূল প্রশ্ন তাই শুধু কত বেশি পোশাক রফতানি করা যাবে—তা নয়; বরং কত বেশি মূল্য সংযোজন করে, কতটা প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং কতটা বৈচিত্র্যময় পণ্য ইউরোপের বাজারে ধরে রাখা যাবে।