ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

১০৯ বছর পর ব্রিটিশ সরকারের কাছে পুরোনো ঋণের টাকা ফেরত চাইলো ভারতীয় পরিবার

১০৯ বছর পর ব্রিটিশ সরকারের কাছে পুরোনো ঋণের টাকা ফেরত চাইলো ভারতীয় পরিবার

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১৫ আগস্ট : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া ৩৫ হাজার রুপি ঋণ ১০৯ বছর পর সুদসহ ফেরত চেয়েছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি পরিবার। পরিবারটির দাবি, ১৯১৭ সালে ব্যবসায়ী জুম্মালাল রুঠিয়া ব্রিটিশ সরকারকে যুদ্ধকালীন ব্যয়ের জন্য ওই অর্থ ধার দিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হিসেবে একটি শতবর্ষী ঋণ সনদও তাদের কাছে রয়েছে।

রুঠিয়া পরিবারের দাবি, ১৯১৭ সালের ৪ জুন ভোপাল এজেন্সিতে কর্মরত ব্রিটিশ সরকারের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে এই অর্থ দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে পরিবারটি ওই সনদের সন্ধান পায়। এরপর একজন আইনজীবীর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

পরিবারটির দাবি পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের ঋণ ব্যবস্থাপনা দপ্তর (ডিএমও) তাদের কাছে আরও নথিপত্র চেয়েছে। এসব নথির মধ্যে রয়েছে ঋণের মূল কাগজপত্র, পারিবারিক বংশতালিকা এবং তৎকালীন লেনদেন-সংক্রান্ত তথ্য।

জুম্মালাল রুঠিয়ার প্রপৌত্র গৌতম রুঠিয়া জানিয়েছেন, ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য তথ্য চেয়ে ই-মেইল পাওয়ায় তারা আশাবাদী হয়েছেন। তবে ব্রিটিশ সরকার এখনো এই দাবি স্বীকার করেনি। নথিপত্র যাচাই শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পরিবারটির কাছে অবশ্য বিষয়টি শুধু অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি নয়। জুম্মালালের নাতি বিনয় রুঠিয়ার ভাষ্য, এটি তাদের কাছে পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত একটি ঘটনা।

কেন ব্রিটিশ সরকারকে টাকা দিয়েছিলেন জুম্মালাল?

রুঠিয়া পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করা ভারতীয় সৈন্যদের ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছিল। সেই সময় এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী জুম্মালাল রুঠিয়া ব্রিটিশ সরকারকে ৩৫ হাজার রুপি দেন।

পরিবারটি এটিকে সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণ নয়, যুদ্ধকালীন ঋণ হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, যুদ্ধের মেয়াদ নির্দিষ্ট না থাকায় ওই নথিতে ব্যাংক ঋণের মতো নির্দিষ্ট পরিশোধের সময়সীমাও ছিল না।

এখন কত টাকা দাবি করবে পরিবার?

৩৫ হাজার রুপি ১০৯ বছর আগে দেওয়া হয়েছিল। ফলে বর্তমানে এর মূল্য কত দাঁড়ায়, তা হিসাব করছে পরিবারটি।

গৌতম রুঠিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, মূল অর্থের পাশাপাশি সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং অন্যান্য সম্ভাব্য খরচও হিসাবের মধ্যে আনা হবে। তবে চূড়ান্ত অঙ্ক এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

পরিবারটি ব্রিটিশ সরকারের অতীত যুদ্ধঋণ পরিশোধের ইতিহাসও খতিয়ে দেখেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নেওয়া বিপুল পরিমাণ সরকারি ঋণের একটি অংশ ২০১৫ সালে পরিশোধ করা হয়েছিল। তবে জুম্মালাল রুঠিয়ার ১৯১৭ সালের ঋণ সেই পরিশোধের আওতায় ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিত্তশালী ব্যবসায়ী ছিলেন জুম্মালাল

রুঠিয়া পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, জুম্মালাল রুঠিয়া সে সময় মধ্যপ্রদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। তার বিশাল ব্যবসার পাশাপাশি প্রায় তিন হাজার গরুর একটি গোশালাও ছিল। পরিবারটির দাবি, তিনি আফিম চাষের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং তার মালিকানায় একটি রোলস-রয়েস গাড়িও ছিল।

১৯৩৭ সালে জুম্মালাল রুঠিয়া মারা যান। এর এক দশক পর, ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। পরিবারের দাবি, ১৯১৭ সালে দেওয়া ওই অর্থ আর কখনো ফেরত দেওয়া হয়নি।

এখন ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

বর্তমানে রুঠিয়া পরিবার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের চাওয়া নথিপত্র সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপর ব্রিটিশ সরকারি নথির সঙ্গে তাদের হাতে থাকা ১৯১৭ সালের দলিল মিলিয়ে দেখা হবে।

দাবিটি প্রমাণিত হলে ১০৯ বছর আগের সেই ঋণ নিয়ে নতুন করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। পরিবারটি প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ ও সালিসি প্রক্রিয়ার কথাও বিবেচনা করছে।

তবে আপাতত সবকিছু নির্ভর করছে একটি প্রশ্নের ওপর—১৯১৭ সালে জুম্মালাল রুঠিয়া সত্যিই ব্রিটিশ সরকারকে ৩৫ হাজার রুপি ঋণ দিয়েছিলেন কি না এবং সেই ঋণ আজকের দিনে আইনগতভাবে ফেরত দাবি করার সুযোগ আছে কি না।

১০৯ বছর পর একটি পুরোনো সনদ সেই প্রশ্নই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।