ব্রিটেন সংবাদ
৩৫০ জনের গ্রামে ১,২৫৬ আশ্রয়প্রার্থী, প্রতিবাদে ‘ব্রিটেন ছাড়ার’ গণভোট
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৫ সেপ্টেম্বর:
মাত্র প্রায় ৩৫০ মানুষের একটি গ্রাম। তার পাশের সাবেক সামরিক ঘাঁটিতে রাখা হবে ১,২৫৬ জন পুরুষ আশ্রয়প্রার্থী। সরকারের এই পরিকল্পনার প্রতিবাদে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য থেকে প্রতীকীভাবে ‘স্বাধীন’ হওয়ার গণভোটে গেল অক্সফোর্ডশায়ারের ছোট্ট গ্রাম পিডিংটন।
আজ মঙ্গলবার গ্রামটির বাসিন্দারা এই প্রতীকী গণভোটে ভোট দিচ্ছেন। এর কোনো সাংবিধানিক বা আইনি ক্ষমতা নেই; এটি মূলত সরকারের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয় ক্ষোভ প্রকাশের একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
পিডিংটনের জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ৩৫০, সেখানে কাছের সাবেক সামরিক স্থাপনায় ১,২৫৬ জন পুরুষ আশ্রয়প্রার্থী রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা গ্রামের জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে তিন গুণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বড় একটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে গ্রামের অবকাঠামো, নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও অন্যান্য জনসেবার সক্ষমতা যথেষ্টভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

বিশেষ করে গ্রামের কিছু নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় কয়েকজন নারী আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণও শুরু করেছেন বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ছোট একটি গ্রামে বিপুলসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে একসঙ্গে রাখলে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও নিরাপত্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে সরকারের যুক্তি ভিন্ন। ব্যবসামন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস বলেছেন, আশ্রয়প্রার্থীদের শহরের হোটেলে রাখার পরিবর্তে সাবেক সামরিক ঘাঁটির মতো স্থানে রাখা তুলনামূলকভাবে বেশি উপযুক্ত। তার বক্তব্য, আশ্রয়প্রার্থীদের কোথাও না কোথাও থাকতে হবে এবং এ দায়িত্ব দেশের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে।
এই বিতর্কে ব্রিটেনের অভিবাসন সংকটের পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে—জাতীয় সংকটের দায়িত্ব কি স্থানীয় জনগণের ওপর সমানভাবে ভাগ করা হচ্ছে, নাকি ছোট ও তুলনামূলক দুর্বল জনপদগুলোই বেশি চাপ বহন করছে?
ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এর আগে বলেছিলেন, শুধু দেশের দরিদ্র এলাকাগুলোর ওপর আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসনের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়; অপেক্ষাকৃত সচ্ছল এলাকাগুলোকেও দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
পিডিংটনের প্রতিবাদ ইতিমধ্যে আশপাশের আরও কিছু ছোট জনপদে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, পিডিংটনের আন্দোলন অন্য ছোট প্যারিশগুলোর জন্যও একটি ‘ব্লুপ্রিন্ট’ হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে।
তবে এই আন্দোলনের সঙ্গে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সঙ্গে বহিরাগত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখা হচ্ছে না—এ বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। দ্য টাইমস জানিয়েছে, একটি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠী পিডিংটনে বড় ধরনের বিক্ষোভের হুমকি দিয়েছে।
ফলে পিডিংটনের ঘটনা এখন আর শুধু একটি গ্রামের স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি ব্রিটেনে অভিবাসন, আশ্রয়নীতি, স্থানীয় গণতন্ত্র এবং সরকারের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক—এই চারটি প্রশ্নকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
৩৫০ জনের একটি গ্রাম আইনগতভাবে ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু তাদের প্রতীকী গণভোটটি সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—অভিবাসন নীতির জাতীয় সিদ্ধান্ত যখন স্থানীয় মানুষের দরজায় এসে পৌঁছায়, তখন সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে তাদের মতামতও উপেক্ষা করা সহজ নয়।