‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪১ ।। ঋণী বেগমের ঋণ শোধ

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪১ ।। ঋণী বেগমের ঋণ শোধ

 

।। ঋণী বেগমের ঋণ শোধ ।।

উৎসর্গ:

তাঁদের প্রতি,
যারা নিজের জীবনে ঋণ না করেও
অন্যের করা ঋণের দায় বহন করেন।

আমার নাম ঋনী, কিন্তু কখনো ঋণ করি নাই!

হাজনের হাট গ্রামের ঋনী বেগমের বয়স পঁচাশি।

বয়স হলেও স্মৃতিশক্তি তাঁর বেশ ভালো। কে তাঁর কাছ থেকে পাঁচ টাকা নিয়েছে, কে দশ টাকা নিয়েছে, কে নিয়ে আর ফেরত দেয়নি—সবই মনে আছে।

তবে নিজের জীবনে তিনি একটা বিষয় নিয়ে খুব গর্বিত। তিনি কখনো ঋণ করেননি। তিনি কয়েক পুরুষ ধরে এলাকার ধনী ও অভিজাত মহিলা। সেজন্য তাঁর ছেলে ও নাতির নামও রেখেছেন তিনি ঐ স্টাইলেই।

ঋণী বেগম ছোটবেলা থেকেই ধর্মভীরু মানুষ। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের টাকা-পয়সার দেনা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া ঠিক নয়। আট-দশ গ্রামের মানুষ তাঁকে সম্মান করে।

তিনি প্রায়ই পরিবার ও অন্যান্য সবাইকে বলেন,

—মানুষের হক রেখে মরতে নেই। আর পারতে কখনো ঋণ করবে না। আমার নাম ঋণী বেগম, কিন্তু আমি জীবনে কখনো ঋণ করি নাই। ব্রিটিশ আমলে তিনি ক্লাশ এইট পাশ করেছিলেন। 

তাঁর উনিশ বছরের নাতি ধন মিয়া প্রতিদিন মোবাইল ফোনে খবর পড়ে শোনায়। দেশ-বিদেশের খবর পড়তে ছেলেটার ভালো লাগে। ঋনী বেগমও মন দিয়ে শোনেন। সব খবর বোঝেন না, তবু শোনেন। ইদানিং কানেও কম শোনেন ঋণী বেগম। অনেক দাঁত পড়ে গেছে। তাই সব কথা স্পষ্ট করে বলতেও পারেন না আজকাল। এখনও দুনিয়ার সব খবর রাখেন। প্রতিদিন তাঁকে পত্রিকা পড়ে শোনাতে হয়। 

এক সকালে ধন মিয়া বলল,

—নানী, আজ একটা বড় খবর আছে।

—কী খবর?

লন্ডন থেকে প্রকাশিত অনলাইন পোর্টাল ‘ভয়েস অব পিপল’-এ চোখ মেলে

 ধন মিয়া মোবাইলের পর্দা দেখে পড়তে শুরু করল,

—“দেশে মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা—দায়টা শেষ পর্যন্ত কার?”

ঋনী বেগম চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—কী বললি?

—মাথাপিছু সরকারি ঋণ এক লাখ ২৯ হাজার টাকা।

—তার মানে, আমারও এই ঋণ ?

ধন মিয়া একটু থামল।

—মানে?

—মাথাপিছু বলছ না? আমার মাথাও তো একটা।

ধন মিয়া হেসে ফেলল।

—নানী, ব্যাপারটা এমন না।

—তাহলে কেমন?

ধন মিয়া খবরের ভেতরের অংশ পড়তে লাগল। রোববার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মাথাপিছু সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা।

ঋনী বেগম এবার সোজা হয়ে বসলেন।

—ভাইরে, আমি জীবনে ঋণ করি নাই।

—জানি।

—কারও টাকা খাই নাই।

—সেটাও জানি।

—তাহলে সরকারের কাছে আমার ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা দেনা হলো কীভাবে? তোর নানার নামেও কি এত টাকা ঋণ আছে? লোকটা মরে গিয়েও ঋনী তাহলে?

—নানী, এত পেরেশান হচ্ছো কেন? তোমার ব্যক্তিগত দেনা না, নানা তো অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁর ঋণ হবে কেন?

—তাহলে “মাথাপিছু” লিখল কেন পত্রিকায় ?

ধন মিয়া উত্তর খুঁজতে লাগল।

ঋনী বেগম বললেন,

—খবরের ভাষা খুব বিপজ্জনক হয়েছে। মানুষকে ভয় দেখায়। এই ঋণের ব্যাপারটা তাঁর মাথায় কাঁটার মতো বিঁধে রইলো।

সেদিন দুপুরে তিনি খাওয়ার মাঝখানেই থেমে গেলেন। নাতি ধন মিয়াকে বললেন,

—ভাইরে, আমি মরার আগে এই ঋণ শোধ করব।

—কোন ঋণ?

—দেশের ঋণ।

ধন মিয়া হেসে বলল,

—তুমি একা দেশের ঋণ শোধ করবে?

—আমার অংশটুকু তো আমি শোধ করতে পারি।

ধন মিয়া বুঝল, নানীকে বোঝানো কঠিন হবে।

সন্ধ্যায় ঋনী বেগম লন্ডনে থাকা ছেলে ‘মূলধন মিয়া’কে ফোন করলেন। কারণ এই সন্তানই এখন তাঁর আসল মূলধন।

ফোন ধরতেই বললেন,

—মূলধন, এক লাখ ২৯ হাজার টাকা পাঠাও।

মূলধন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

—কী হয়েছে মা?

—দেশের ঋণ শোধ করব।

—দেশের ঋণ?

—হ্যাঁ। আমার মাথায় যে ঋণ পড়েছে।

মূলধন চোখ বন্ধ করল।

লন্ডনে ছেলে মূলধন মিয়ার নিজের অবস্থাও ভালো নয়। স্ত্রী আলাদা থাকেন। সন্তানরা মায়ের সঙ্গে থাকে। নিজেরও এখন স্থায়ী থাকার জায়গা নেই। কাউন্সিলে বাড়ির জন্য আবেদন করেছে। এখন থাকছে এক বন্ধুর বাড়ির সোফা সেটে। সেখান থেকে শুধু বলা হয়েছে—আরও অপেক্ষা করতে হবে।

মাকে এসব বলা যায় না।

মা চিন্তা করবেন।

তাই স্বাভাবিক গলায় বলল,

—মা, টাকা দিয়ে কী করবে?

—সরকারকে দেব।

—কোথায়?

—সেটাই তো তোমাকে জিজ্ঞেস করছি। কোন ব্যাংকে জমা দিতে হয়?

মূলধন একটু হেসে বলল,

—মা, আগে ভালো করে খোঁজ খবর করে ঘটনাটা বুঝে নাও।

—বুঝে ফেলেছি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে বলেছেন।

—তুমি মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে কথা বলবে?

—অবশ্যই। উনিই জানবেন কোথায় টাকা দিতে হয়।

মূলধন বলল,

—মা, আমারও তো.. অবস্থা....

কথাটা শেষ করল না।

—তোমারও কী?

—না, কিছু না।

ঋনী বেগম বললেন,

—তুমি টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করো। আমি মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে কথা বলব।

পরদিন থেকেই অর্থমন্ত্রীর ফোন নম্বর খোঁজা শুরু হলো।

প্রথমে গেলেন ইউনিয়ন পরিষদে। একজন কর্মকর্তাকে বললেন,

—বাবা, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ফোন নম্বরটা কি পাওয়া যাবে?

কর্মকর্তা অবাক হয়ে তাকালেন।

—কেন?

ঋনী বেগম একটু লজ্জা পেলেন। চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন,

—একটা দেনা শোধ করতে চাই।

—কী দেনা?

—সরকারের।

—আপনার?

ঋনী বেগম মাথা নিচু করলেন।

—হ্যাঁ।

কর্মকর্তা বললেন,

—আপনার সরকারের কাছে দেনা আছে?

ঋনী বেগম একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,

—আমার মাথাপিছু যে ঋণ হয়েছে, সেইটা আরকি। আমি তো বাবা, ঋণ নিয়ে মরবো না।

কর্মকর্তা এবার মৃদু হাসলেন।

ঋনী বেগম সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

—হাসবেন না বাবা। আমার নাম ঋনী বেগম হলেও আমি কিন্তু ঋণ করি নাই। 

অফিসার মৃদু হেসে চা-বিস্কুট খাইয়ে বিদায় করে দিলেন। কী আর করা। নাতিকে সাথী করে ফিরে আসতে হলো ঋণী বেগমকে।

এরপর উপজেলা অফিস। সেদিন এক বৃদ্ধ দেবরকে সাথে নিয়ে গেলেন। তাঁর বয়সও প্রায় ৭০ এর কাছাকাছি।

সেখানে গিয়েও একই প্রশ্ন।

—মন্ত্রী সাহেবের নম্বর দিয়ে কী করবেন?

—আমার অংশের টাকা কোথায় জমা দেব, সেটা জানতে চাই।

একজন কর্মচারী তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন,

—মা, ‘মাথাপিছু সরকারি ঋণ’ মানে, আপনার নামে ব্যক্তিগতভাবে ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা ধার নেই।

ঋনী বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—তাহলে আমার টাকা লাগবে না?

—না।

—তাহলে দেশের ঋণ কে শোধ করবে?

—সরকার।

ঋনী বেগম এবার খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করলেন,

—সরকার টাকা পায় কোথা থেকে?

কর্মচারী চুপ।

ঋনী বেগম নিজেই বললেন,

মানুষের কাছ থেকে। কর নেয়, টাকা নেয়। তারপর ঋণ করে। আবার সেই ঋণ শোধও করে মানুষের টাকা দিয়ে।

ঘরের ভেতর কয়েকজন এবার চুপচাপ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ঋনী বেগম বললেন,

—আমি অর্থনীতির কিছু বুঝি না বাবা। কিন্তু এইটুকু বুঝি—ধার করলে একদিন না একদিন টাকা ফেরত দিতে হয়।

কর্মচারী বললেন,

—আপনার আলাদা করে টাকা দেওয়ার দরকার নেই।

—ঠিক আছে। কিন্তু মন্ত্রী সাহেবের সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।

—কী বলবেন?

ঋনী বেগম একটু ভেবে বললেন,

বলব, “মন্ত্রী সাহেব, আমার টাকা লাগবে না বুঝলাম। কিন্তু দেশের টাকা কোথায় গেল, সেটা একটু বলেন।” এদিকে যায়বেটিসের রোগী, দেবর দৌলত খান অধৈর্য হয়ে উঠছেন ক্রমশ। তিনি তাড়া দিলেন...

—ভাবী, তোমার এসব প্যাচাল বাদ দিয়ে বাড়ি চলো, আমারে বাড়িতে গিয়ে কিছু খাইতে অইবো।

— তোমার তো খাওয়া আর খাওয়ার অভ্যাস গেল না। এদিকে আমি যে সরকারের কাছে ঋণী হয়ে আছি, সেদিকে তোমার কোন খেয়াল নেই। উঠো, তাহলে গাড়িতে, চলো এখন বাড়িতে।

বাড়ি ফিরে নাতি ধন মিয়াকে সব বললেন।

ধন মিয়া হেসে বলল,

—নানী, তুমি সত্যিই মন্ত্রীকে ফোন করবে?

—করব।

—ফোন যদি না ধরেন মন্ত্রী ?

—আবার করব।

—নম্বর না পেলে?

—অফিসে যাব।

—অফিসে ঢুকতে না দিলে?

ঋনী বেগম কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—দরজার সামনে বসে থাকব।

—কেন?

—দেশের ঋণ শোধ করতে এসেছি। আমাকে ঢুকতে দেবে না কেন?

ধন মিয়া হেসে ফেলল।

রাতে নামাজ পড়ে ঋনী বেগম অনেকক্ষণ দোয়া করলেন।

দেশের জন্য দোয়া করলেন।

ছেলে মূলধনের জন্য দোয়া করলেন।

তারপর বললেন,

—হে আল্লাহ, আমার নামে কোনো ঋণ থাকলে আমাকে জানিয়ে দিও স্বপ্নে। আর দেশের যে ঋণ আছে, যারা করেছে তাদের বুদ্ধি দাও—কীভাবে শোধ করবে সেটাও বুঝিয়ে দাও।

পরদিন সকালে ধন মিয়া আবার বুঝিয়ে বলল,

—নানী, তোমার নামে আলাদা করে ১ লাখ ২৯ হাজার টাকার কোনো ঋণ নেই। এটা গড় হিসাব।

ঋনী বেগম এবার কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

—তাহলে মূলধনের কাছে টাকা চাইতে হবে না?

—না।

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—ভালোই হয়েছে। ছেলেটার নিজের অবস্থাই তো ভালো না।

ধন মিয়া অবাক হয়ে নানীর দিকে তাকাল।

মূলধনের কষ্টের খবর ঋনী বেগম জানেন না। ছেলে মায়ের কাছে নিজের দুর্দশা লুকিয়ে রেখেছে।

কিন্তু মায়ের মন বোধহয় কিছু কিছু খবর কাগজে না পড়েও পড়ে ফেলে।

ঋনী বেগম জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—দেশের ঋণ থাকুক। কিন্তু আমার ছেলেটার যেন একটা নিজের ঘর হয়।

ধন মিয়া কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর ঋনী বেগম হঠাৎ বললেন,

—ভাই, একটা কথা লিখে রাখো।

—কী?

তিনি মৃদু হেসে বললেন,

আমার নাম ঋনী। কিন্তু আমি ঋণ করি নাই।

ধন মিয়াও হেসে ফেলল।

তবে হাসির আড়ালে একটা প্রশ্ন থেকে গেল।

মাথাপিছু ঋণ যদি সবার নামে ভাগ হয়, তাহলে সেই ঋণের দায়ও কি সবার?

আর ঋণ করার সময় যদি সাধারণ মানুষের অনুমতি না লাগে, তাহলে সেই ঋণের টাকা কোথায় খরচ হলো—সেই হিসাব জানার অধিকার কি সাধারণ মানুষের নেই?

ঋনী বেগম অর্থনীতির এসব কঠিন হিসাব বোঝেন না।

তিনি শুধু একটা সহজ কথা বোঝেন—

ধার করলে শোধ করতে হয়।

আর তাঁর এখন একটাই ভয়—

একদিন যেন ধন মিয়া তাঁকে আবার খবর পড়ে না শোনায়,

“নানী, এবার তোমার মাথায় দুই লাখ টাকা ঋণ পড়েছে।”

কারণ তখন হয়তো অর্থমন্ত্রীর ফোন নম্বর খুঁজতে তাঁকে ঢাকায় যেতে হবে।

এই বয়সে এতদূরে রাজধানী ঢাকায় রাস্তায় ঋণ শোধ করতে যাওয়া খুব সহজ কাজ নয়।

লন্ডন, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬।