ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
দেশে আর কতদিন চলবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট?
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৬ আগস্ট:
দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট নিয়ে মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে সর্বোচ্চ সরবরাহ মিলছে ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার ৫৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তির কথা উঠে আসছে। শিল্পকারখানা থেকে বাসাবাড়ি—দুই খাতেই জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের কথা বললেও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশে আর কতদিন চলবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গ্যাসকূপ, এলএনজি টার্মিনাল ও সঞ্চালন অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সংকট পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা নেই। এসব প্রকল্পের কোনোটি বাস্তবায়নে এক-দুই বছর, আবার কোনো ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার, সরবরাহ ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট
দেশে বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং এলএনজি সরবরাহে সীমাবদ্ধতার কারণে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে।
শনিবার বিকেলে পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৮১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এলএনজির মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জি থেকে ৩০০ এবং সামিট থেকে ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়।
এর আগে দুটি এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে গিয়েছিল মাত্র ২ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুটে।
একটি টার্মিনালের ত্রুটিতে বড় ধাক্কা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও স্বীকার করেছেন, সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের পেছনে এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার বড় ভূমিকা রয়েছে।
শনিবার ঢাকা-১৭ আসনে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় তিনি বলেন, দেশের মানুষের গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুতের জন্যও কষ্ট হচ্ছে। বিদেশ থেকে জাহাজে করে এলএনজি এনে সংরক্ষণের জন্য দেশে মাত্র দুটি ভাসমান স্টোরেজ ব্যবস্থা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুটি ভাসমান জাহাজের একটিতে হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটায় গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কারিগরি ত্রুটি সারানো হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির অনেকাংশে উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য মানুষের দুর্ভোগের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ বিদ্যুতের জন্য যে কষ্ট পাচ্ছে, আমি আন্তরিকভাবে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তবে সংকট কি কয়েক দিনেই শেষ হবে?
টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা সমাধান হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে। কিন্তু এতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকটের সমাধান হবে না।
কারণ, গত পাঁচ বছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। পাঁচ বছর আগে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ২ হাজার ৪৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুটে।
সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একসময় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৭৪১ মিলিয়ন ঘনফুট।
অর্থাৎ টার্মিনালের সাময়িক সমস্যা ঠিক হলেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পতন থেকেই যাচ্ছে।
টার্মিনাল পুরো চালু হলেও ঘাটতি থাকবে
দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মোট সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৮১০ মিলিয়ন ঘনফুট। দুটি টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় চালু হলে আরও প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে।
তাতেও মোট চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থেকে যাবে।
জ্বালানি কর্মকর্তারা বলছেন, চাইলেই এখন দেশীয় উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। নতুন কূপ খনন, গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন এবং উৎপাদন শুরু করতে সময় প্রয়োজন। আবার বিদেশ থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনলেও তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত টার্মিনাল ও সঞ্চালন অবকাঠামো প্রয়োজন।
নতুন টার্মিনাল আসতে সময় লাগবে
সরকার নতুন করে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। চীনের একটি কোম্পানিকে একটি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে। সেটি চালু হতে প্রায় ২২ মাস সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিনিয়োগকারী খোঁজার কাজ চলছে।
তবে টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত সঞ্চালন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ জন্য সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন গ্যাস পেতে অপেক্ষা কয়েক বছর
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও দ্রুত সমাধানের সুযোগ নেই। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কোনো কোম্পানি কাজ পেলেও অনুসন্ধান, আবিষ্কার, উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করতে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগতে পারে।
স্থলভাগে এখন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও সেখান থেকে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
সরকার বাপেক্সের মাধ্যমে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি আরও দুটি রিগ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটও গ্যাসের সঙ্গে জড়িত
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না।
এর ফলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রীও শনিবারের বক্তব্যে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের বিদ্যুতের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করেছেন।
ফলে গ্যাস সংকটকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও জড়িয়ে রয়েছে।
১০ বছরের পরিকল্পনা সংসদে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি সমস্যা কীভাবে আগামী ১০ বছরে সমাধান করা হবে, সেই পরিকল্পনা আগামী ২৭ আগস্ট সংসদ অধিবেশনে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধানের ভালো পরিকল্পনা থাকলে সরকার সেটিও গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে। তবে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চায় এবং দেশকে পৃথিবীর বুকে এগিয়ে নিতে চায়।
দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস মজুত নিয়েও শঙ্কা
গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় কারণ দেশের মজুত কমে আসা। সিপিডির সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে গ্যাসের ব্যবহার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান হারে ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩০-এর দশকের শুরুতেই অবশিষ্ট গ্যাস মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
তাই শুধু এলএনজি আমদানি করে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করলেই হবে না; নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, গ্যাসের অপচয় কমানো এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও জোর দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলমের মতে, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হলেও ভবিষ্যৎ মজুত ও সরবরাহের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা হয়নি।
তার মতে, দামি এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, কয়লা এবং নেপাল-ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মতো বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হবে।
তবে এসব উদ্যোগের অধিকাংশই তাৎক্ষণিকভাবে ফল দেবে না। কোনো প্রকল্পে দুই বছর, আবার বড় অনুসন্ধান ও অবকাঠামো প্রকল্পে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তাহলে কতদিন চলবে সংকট?
বর্তমান পরিস্থিতিতে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা সমাধান হলে আগামী কয়েক দিনে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে—সরকারও এমন আশার কথা জানিয়েছে। কিন্তু দেশের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন গ্যাসক্ষেত্রের ঘাটতি, এলএনজি আমদানিনির্ভরতা, টার্মিনালের সীমিত সক্ষমতা এবং দুর্বল সঞ্চালন অবকাঠামো—সব মিলিয়ে সংকটটি কাঠামোগত রূপ নিয়েছে।
ফলে সামনে মূল প্রশ্ন শুধু ‘কয়েক দিনে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে কি না’ নয়; বরং আগামী দুই, পাঁচ কিংবা দশ বছরে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।