ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

দেশের প্রায় সব বিক্রেতা খাদ্যে করে জাল, প্রতিটি দ্রব্যে তাই ভেজাল!

দেশের প্রায় সব বিক্রেতা খাদ্যে করে জাল, প্রতিটি দ্রব্যে তাই ভেজাল!

খাদ্য মানুষের জীবন বাঁচায়। অথচ বাংলাদেশে সেই খাবারই এখন নানা ধরনের ভেজাল, রাসায়নিক, ভারী ধাতু ও জীবাণুর বাহক হয়ে উঠছে। চাল-ডাল থেকে শুরু করে সবজি, মসলা, তেল, মুড়ি, সস, আচার, গুড়, মিষ্টি, মধু, ঘি, দুধের গুঁড়া, পানীয় ও পানি—নিত্যদিনের খাদ্যতালিকার একের পর এক পণ্যের নমুনায় ধরা পড়েছে অনিরাপদ উপাদান।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। খাদ্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটিও বলছে, তাদের অভিযান চলছে; তবে পর্যাপ্ত ল্যাব ও জনবলের সংকট রয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—ভেজালের ধরন এক নয়। একেক খাদ্যে একেক ধরনের অনিরাপদ উপাদান পাওয়া গেছে।

সবজিতে সিসা, সঙ্গে রোগজীবাণু

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা শাকসবজির নমুনায় পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক মাত্রার ভারী ধাতু। যেখানে সবজিতে সিসার স্বাভাবিক সীমা ০.৩ পিপিএম, সেখানে কোনো কোনো নমুনায় সর্বোচ্চ ২.৩৭ পিপিএম পর্যন্ত সিসা শনাক্ত হয়েছে।

কিছু নমুনায় আবার ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম ও সালমোনেলার মতো জীবাণুও পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ বাজারের টাটকা সবজির চেহারা দেখে নিরাপদ মনে হলেও পরীক্ষাগারে তার ভেতরের গল্প একেবারেই ভিন্ন।

মরিচের গুঁড়ায় নিষিদ্ধ সুদান ডাই

কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও বগুড়ার মরিচের গুঁড়ার নমুনায় পাওয়া গেছে নিষিদ্ধ কৃত্রিম রং সুদান ডাই।

কক্সবাজারের একটি নমুনায় এর মাত্রা ছিল ১ হাজার ২৪২.৩২৪ পিপিএম। প্রতিবেদনে এটিকে ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ রং হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ রান্নাঘরের মসলার কৌটিতেও লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।

ডালডায় সীমার ১৫ গুণের বেশি ট্রান্স ফ্যাট

কুমিল্লার একটি ডালডার নমুনায় ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে ৩০.৯৮ শতাংশ। অথচ অনুমোদিত সীমা ২ শতাংশ।

ভোলার নমুনায় ২৩.৯৩ শতাংশ এবং পাবনার নমুনায় ২০.৫৩ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে।

মাখন ও মার্জারিনের নমুনাতেও যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৮.৪৪ ও ১০.৭ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাট শনাক্ত হয়েছে।

মুড়িতে ইউরিয়া

সকালের নাস্তা কিংবা বিকেলের হালকা খাবার হিসেবে পরিচিত মুড়িও বাদ যায়নি।

ঝালকাঠি থেকে সংগৃহীত একটি মুড়ির নমুনায় পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৫৮.৭ মিলিগ্রাম ইউরিয়া। ফেনী, ঠাকুরগাঁও ও সাতক্ষীরার নমুনাতেও উচ্চমাত্রার ইউরিয়া পাওয়া গেছে।

সস ও আচারে অতিরিক্ত বেনজোয়িক অ্যাসিড

সস ও আচারে সংরক্ষণকারী হিসেবে ব্যবহৃত বেনজোয়িক অ্যাসিডের মাত্রাও কোথাও কোথাও অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়েছে বহুগুণ।

সসে অনুমোদিত সীমা ৭৫০ পিপিএম হলেও রংপুরের একটি নমুনায় পাওয়া গেছে ২৩ হাজার ২৭২ পিপিএমের বেশি।

কুড়িগ্রাম ও ভোলার আচারের নমুনাতেও ১ হাজার পিপিএম সীমার বিপরীতে ৩ হাজার পিপিএমের বেশি বেনজোয়িক অ্যাসিড পাওয়া গেছে।

 খাবার পানিতে মলজাতীয় জীবাণু

খাদ্যের সঙ্গে যে পানি প্রতিদিন মানুষের শরীরে যাচ্ছে, সেখানেও রয়েছে বড় উদ্বেগ।

বাগেরহাট, দিনাজপুর ও খাগড়াছড়ির পানির নমুনায় ফেক্যাল কলিফর্ম ও টোটাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে।

দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ ফেক্যাল কলিফর্ম পাওয়া গেছে। খাগড়াছড়িতে ৬০ এবং বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ শনাক্ত হয়েছে।

ফেক্যাল কলিফর্মের উপস্থিতি পানিতে মানুষ বা পশুর মলমূত্রের দূষণের ইঙ্গিত দেয়।

রান্না করা খাবারও নিরাপদ নয়

শুধু কাঁচা খাদ্যপণ্য নয়, প্রস্তুত খাবারের নমুনাতেও জীবাণু পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় থেকে সংগৃহীত মোরগ পোলাও, চিংড়ি ও ভাতের নমুনায় ই-কোলাই এবং সালমোনেলার মতো রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে।

সরিষার তেলে অতিরিক্ত অ্যাসিড

লক্ষ্মীপুর থেকে সংগৃহীত সরিষার তেলের একটি নমুনায় অ্যাসিড ভ্যালু পাওয়া গেছে ৫.৩। অথচ সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৩.০।

এ ছাড়া ভোজ্য তেলে ট্রান্স ফ্যাটের অনুমোদিত সীমা ২ শতাংশ হলেও কোনো কোনো নমুনায় সর্বোচ্চ ৬.৬২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

সয়াবিন তেলের কিছু নমুনায় আবার ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি ধরা পড়েছে।

গুড় ও জিলাপিতেও রাসায়নিক

রাজশাহী, গাজীপুর ও নাটোরের খেজুর ও আখের গুড়ের নমুনায় নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং সাবানজাতীয় সারফেস অ্যাক্টিভ উপাদান পাওয়া গেছে।

কক্সবাজার, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের জিলাপির নমুনাতেও সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট শনাক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ মিষ্টি খাবারের মিষ্টিতেও মিশে আছে অনিরাপদ উপাদানের আশঙ্কা।

মধুতে অতিরিক্ত চিনি, ঘিতে নেই পর্যাপ্ত দুধের চর্বি

খুলনার মধুর নমুনায় অতিরিক্ত সুক্রোজ পাওয়া গেছে। অন্যান্য জেলার নমুনায় অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজও শনাক্ত হয়েছে।

রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘির নমুনায় মিল্ক ফ্যাটের পরিমাণ কম বা অনুপস্থিত ছিল। ফলে এসব পণ্য প্রকৃত ঘির মান পূরণ করেনি।

বরিশালের মিল্ক পাউডারের একটি নমুনায় পাওয়া গেছে সিসা।

সফট ড্রিংকেও রাসায়নিক

ফলের পানীয়, সফট ড্রিংক ও কৃত্রিম ফ্লেভারযুক্ত পানীয়ের নমুনাতেও অতিরিক্ত বেনজোয়িক অ্যাসিড, টারট্রাজিন ও ক্যাফেইনের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

অর্থাৎ পানীয় মানেই নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তাও থাকছে না।

ভেজালের তালিকা যত দীর্ঘ, নজরদারির প্রশ্ন তত বড়

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ এবং ভোক্তার খাবার টেবিল—প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি দরকার।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন খাদ্য নিরাপত্তা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিয়মিত নমুনা পরীক্ষার ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে, জরিমানা করা হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধও করা হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত ল্যাব ও জনবলের সংকটের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

প্রশ্ন এখন একটাই—ভোক্তা যাবে কোথায়?

একজন সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে সবজিতে সিসা আছে কি না পরীক্ষা করতে পারেন না। মরিচের গুঁড়ায় সুদান ডাই, মুড়িতে ইউরিয়া কিংবা পানিতে ফেক্যাল কলিফর্ম আছে কি না, সেটিও তার জানার উপায় নেই।

তিনি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপরই নির্ভর করেন।

তাই খাদ্য নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু ক্রেতাকে ‘সচেতন’ করে শেষ করা যাবে না। বাজারে অনিরাপদ পণ্য ঢোকার আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও নমুনা পরীক্ষা, মোবাইল কোর্ট প্রতিবেদন ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা আরও বেশি—কোন খাবারে কী পাওয়া গেছে, কোন পণ্য নিরাপদ নয় এবং দায়ী কারা—এসব তথ্য দ্রুত ও নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে আসুক।

কারণ খাবার মানুষের বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার প্রয়োজন।

বাজারে যদি প্রতিটি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সঙ্গে ভেজালের ভয়ও কিনতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—

দেশের প্রায় সব বিক্রেতা খাদ্যে করে জাল, প্রতিটি দ্রব্যে তাই ভেজাল!

এ অবস্থা বদলাতে শুধু অভিযান নয়, দরকার নিয়মিত পরীক্ষা, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং এমন শাস্তি—যাতে মানুষের খাবারে ভেজাল মেশানোকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে কেউ আর বিবেচনা না করে।