ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
জাতিসংঘের সতর্কতা, সরকারের ‘আমলে না নেওয়া’: বাংলাদেশকে ঘিরে আল-কায়েদার নতুন উদ্বেগ
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৮ আগস্ট:
ঢাকা: বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা—আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)—ঘিরে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জাতিসংঘের যে প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তিনি সেটি পড়েননি এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সরকার তা আমলে নিচ্ছে না।
সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রতিবেদনটি সরাসরি দেখেননি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সেখানে বাংলাদেশকে ঘিরে একটি সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘অনুমাননির্ভর কোনো রিপোর্টের ওপর আমরা নির্ভর করতে পারি না।’
কিন্তু জাতিসংঘের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, আল-কায়েদা ও AQIS নিয়ে উদ্বেগটি একেবারে নতুন কোনো বিষয় নয়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ৩৭তম Analytical Support and Sanctions Monitoring Team-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, AQIS এখনো দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে সক্রিয়। সংগঠনটির আমির ওসামা মাহমুদ এবং তাঁর ডেপুটি ইয়াহিয়া ঘৌরি কাবুলে অবস্থান করছেন বলে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। AQIS-এর মিডিয়া সেল হেরাতে সক্রিয় বলেও জানানো হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে AQIS-এর বহির্মুখী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটি এমন কর্মকাণ্ডের দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছে, যেগুলো সরাসরি AQIS-এর নামে নাও দাবি করা হতে পারে। অর্থাৎ পরিচয় গোপন রেখে বা অন্য কোনো ছাতার সংগঠনের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, আফগানিস্তানে আল-কায়েদা এখনো সক্রিয় এবং সেখানে তালেবান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে বলে মনিটরিং টিমের মূল্যায়ন রয়েছে। আল-কায়েদা অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গটিও একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। জাতিসংঘের আগের পর্যবেক্ষণগুলোতে AQIS-এর সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের নাগরিকদের থাকার কথা উঠে এসেছে। ২০২২ সালের একটি জাতিসংঘ প্রতিবেদনে AQIS-এর আনুমানিক ১৮০ থেকে ৪০০ সদস্যের কথা বলা হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ওই চার দেশের নাগরিক থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
আরও আগে জাতিসংঘের একটি মূল্যায়নে একটি সদস্যরাষ্ট্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, আল-কায়েদা AQIS-কে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভারতের জম্মু-কাশ্মীর ও মিয়ানমারে কার্যক্রম বিস্তারের জন্য প্রস্তুত করছে।
অর্থাৎ, জাতিসংঘের নথিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যে উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে শুধু সাম্প্রতিক একটি ‘অনুমান’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একই সঙ্গে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে জাতিসংঘের প্রকাশ্য ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে AQIS-এর একটি সক্রিয় সেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। বরং আঞ্চলিক বিস্তার ও সম্ভাব্য বহির্মুখী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা এখনো উচ্চ। এই অঞ্চলে AQIS-সহ আল-কায়েদা ও আইএস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আল-কায়েদা ও আইএস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাও চালু রেখেছে। সর্বশেষ ৮ জুলাই ২০২৬-এর হালনাগাদ তালিকায় ২৪৯ ব্যক্তি ও ৮৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি কেবল ‘জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুমাননির্ভর কি না’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয় একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক যখন বাংলাদেশকে সম্ভাব্য বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে বলে বিভিন্ন সময়ের আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে, তখন সেটিকে আগেভাগে যাচাই ও মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কতটা শক্তিশালী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—প্রমাণ ছাড়া কোনো আশঙ্কাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে সতর্কবার্তার মূল্য ঠিক সেখানেই—হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি দেখা দেওয়ার আগেই তা যাচাই করা।
বাংলাদেশের জন্য তাই জাতিসংঘের সতর্কতাকে আতঙ্ক হিসেবে নয়, তথ্য যাচাই, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা—এটাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।