ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে দিলে ঘুষ, হয় হুশ, নইলে বেহুশ!

শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে দিলে ঘুষ, হয় হুশ, নইলে বেহুশ!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৮ আগস্ট:

শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি ঠেকানোর দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের, সেই পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর—ডিআইএ—নিয়েই উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ। অভিযোগের ধরন এমন যে, পরিদর্শনের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, টাকা দিলে ‘ছাড়’, আর না দিলে নেতিবাচক প্রতিবেদনের আতঙ্ক—দীর্ঘদিন ধরে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

শিক্ষা খাতে দুর্নীতি রোধে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ডিআইএ। অথচ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেই এখন অভিযোগ, পরিদর্শন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেদন দেওয়া হয় না। বছরের পর বছর ফাইল পড়ে থাকে। আবার একই প্রতিষ্ঠানে প্রতিবেদন না দিয়েই নতুন করে পরিদর্শনে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এই প্রতিবেদক ১৯৮৮ থেকে ২০০০ সময়কালে নিজে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে বিভিন্ন কারনে যাতায়াতের সময় থেকে একই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন অনেকবার।

ডিআইএ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে পরিদর্শন করা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন এখনো আলোর মুখ দেখেনি। অর্থাৎ পরিদর্শন হয়েছে, কিন্তু তার ফলাফল কী—সেটি জানার অপেক্ষায় কেটে গেছে বছরের পর বছর।

এর মধ্যেই সামনে এসেছে ঘুষ দাবির একাধিক অভিযোগ। রাজধানীর গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি তদন্তকে ঘিরে অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত অভিযোগ উপেক্ষা করে একপক্ষকে সুবিধা দিতে তদন্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক শিক্ষকের অভিযোগ, ওই তদন্তের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চাঁদপুরের ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় নিয়েও তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে তদন্তের নামে ১০ লাখ টাকা ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অভিযোগগুলো শুধু পরিদর্শন বা তদন্তে সীমাবদ্ধ নয়। ডিআইএর অভ্যন্তরে বদলি-বাণিজ্য, পদায়ন, নিয়োগে অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং দীর্ঘদিন একই দপ্তর বা শাখায় অবস্থান করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, একই জায়গায় বছরের পর বছর অবস্থান করার সুযোগ পাওয়ায় কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী দপ্তরের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করেছেন। নতুন কর্মকর্তা এলেও পুরনো প্রভাবশালী চক্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ডিআইএর স্থায়ী কর্মচারীদের একটি অংশকে ঘিরেও উঠেছে অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পরিচালক ও কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে তারা বদলি, পদায়ন ও নিয়োগসহ নানা বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিচালকদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব রাখার অভিযোগ রয়েছে।

পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে, সম্প্রতি ডিআইএ থেকে পরিচালকসহ কয়েকজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, পুরনো প্রভাবশালী বলয়ের পুরোপুরি অবসান এখনো হয়নি।

ডিআইএর বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক মো. আফলাতুন নিজেই স্বীকার করেছেন, ভয় দেখিয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ঘটনা তিনি জানতে পেরেছেন। পুরনো কাগজপত্র চেয়ে শিক্ষককে আতঙ্কিত করা, সামান্য ঘাটতিকে বড় করে দেখানোর ভয় দেখানো কিংবা ‘নেগেটিভ রিপোর্ট’ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তার ভাষায়, অনেক শিক্ষকই অসহায়। কোনো অনিয়ম থাকলেও কেউ টাকা দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন, আবার অনিয়ম না থাকলেও নেতিবাচক প্রতিবেদনের ভয় থেকে অনেকে টাকা দেন।

এই বাস্তবতায় ডিআইএর ভাবমূর্তি উদ্ধারে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ছয় মাস পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ রেখে আগের অডিট ও পরিদর্শনের প্রতিবেদন নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুরনো ফাইলের জট খুলে প্রকৃত চিত্র সামনে আনার পাশাপাশি পরিদর্শন ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

ডিআইএর পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো হয়েছে—পরিদর্শন ও প্রতিবেদন দেওয়াই তাদের ক্ষমতার মধ্যে পড়ে; শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের। ফলে পরিদর্শনের নামে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তি টাকা দাবি করলে ভয় না পেয়ে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও ডিআইএ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার অভিযোগ, শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিআইএতে পদায়ন পাওয়ার আগ্রহ বেশি। কারণ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে এক মাসের এমপিওর সমপরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—যে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি খুঁজে বের করার কথা, সেই প্রতিষ্ঠানেই যদি দুর্নীতির অভিযোগ জমতে থাকে, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার দায়িত্ব পালন করবে কে?

ঘুষ দিলে যদি রিপোর্ট নরম হয়, আর ঘুষ না দিলে আতঙ্কের রিপোর্ট—তাহলে নিয়ম কোথায়, আর জবাবদিহিই বা কোথায়?

ডিআইএর নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু পুরনো ফাইল নিষ্পত্তি নয়; ‘ঘুষ দিলে হয় হুশ, নইলে বেহুশ’, মানে ঘুষ না দিলে কোন কাজ হয় না—এমন অভিযোগনির্ভর সংস্কৃতি ভেঙে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিদর্শন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।