ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফেইসবুকে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’ জানাতেই বিনা নোটিশে প্রভাষক বরখাস্ত !
নিজস্ব প্রতিবেদক, ১৮ আগস্ট:
রাজশাহীর চারঘাটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়াই যেন হয়ে গেল ভয়ংকর অপরাধ! ১৫ আগস্ট তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে ক্যাপশনে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’ লিখেছিলেন নন্দনগাছী কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতির প্রভাষক সোহেলী আক্তার। ফলাফল—সাময়িক বরখাস্ত।
তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ এখানেই নয়। বরখাস্ত করার আগে তাঁকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশই দেওয়া হয়নি।
অর্থাৎ, অভিযোগ কী, অপরাধ কী, অভিযুক্তের বক্তব্য কী—এসব জানার আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। শোকজ পরে হবে। কর্তৃপক্ষের ভাষায়, ‘এটাও হবে।’
এ যেন প্রশাসনিক ব্যবস্থার নতুন সংস্করণ—আগে শাস্তি, পরে কারণ খোঁজা!
১৫ আগস্ট উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ছবিতে ‘গভীর শোক’ এবং ক্যাপশনে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’—এই পোস্টের মধ্যেই কলেজ কর্তৃপক্ষ এমন কিছু খুঁজে পেয়েছে, যার কারণে একজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা প্রয়োজন মনে হয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ ওয়াহেদুল ইসলামের দাবি, ওই শিক্ষক ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রধানকে’ নিয়ে পোস্ট করেছেন। তাঁর মতে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কেউ এমন পোস্ট দিতে পারেন না।
কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি সাইফুল ইসলামও জানিয়েছেন, তাঁরা বসে সর্বসম্মতিক্রমে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু শোকজ করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নে তাঁর স্বীকারোক্তি, ‘এটা হয়নি।’
তারপরও সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।
আর যাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত, সেই সোহেলী আক্তারই জানেন না তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এটা আমি জানি না। আমার কী দোষ সেটাও তো জানি না।’
এখানেই প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে সামনে আসে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে যে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, ১৫ আগস্ট তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁর ছবিতে ‘গভীর শোক’ জানানো এবং ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’ প্রকাশ করা—সেটি যদি এখন চাকরি হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শ্রদ্ধা প্রকাশের ক্ষেত্রেও কি এখন অপরাধের সংজ্ঞা নতুন করে লেখা হচ্ছে?
আর যদি পোস্টটি সত্যিই বিধিবহির্ভূত হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও যাচাইয়ের নিয়ম আছে। অভিযোগ জানানো যায়, কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া যায়, তদন্ত করা যায়, অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া যায়। কিন্তু এসব বাদ দিয়ে সরাসরি বরখাস্ত—এ কেমন শৃঙ্খলা?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষক কোনো বিধি লঙ্ঘন করলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতেই পারে। কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষার নামে নিয়মকেই যদি শৃঙ্খলমুক্ত করে দেওয়া হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিয়ে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় তাই ফেসবুক পোস্ট নয়; বরং প্রক্রিয়াটি।
আজ ফেসবুকে একটি পোস্টের কারণে শোকজ ছাড়াই বরখাস্ত। কাল হয়তো কোনো মন্তব্য, পরশু কোনো ছবি—আর তার পরদিন সিদ্ধান্ত। তারপর একদিন কর্তৃপক্ষ বসে ভাববে, আসলে অপরাধটা কী ছিল!
তখন হয়তো নতুন প্রশাসনিক নীতি চালু হবে—
‘আগে বরখাস্ত করুন, পরে শোকজ দিয়ে অপরাধটি জেনে নিন।’
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পোস্ট করা যদি অপরাধ হয়, তবে অভিযোগটি স্পষ্ট হোক, বিধি দেখানো হোক, শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হোক। আর যদি অপরাধ না হয়, তাহলে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’ প্রকাশের কারণে একজন শিক্ষকের চাকরি নিয়ে টানাটানি কেন?