ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
খরা মোকাবিলার জরুরি পরিকল্পনা গোপন, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ
লন্ডন, ১৮ আগস্ট: ব্রিটেনে ভয়াবহ খরা পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হওয়ার মধ্যেই পানি সংকট মোকাবিলায় পানি কোম্পানিগুলোর তৈরি করা জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশ না করায় সরকারের বিরুদ্ধে স্বচ্ছতার ঘাটতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের দাবি, চরম খরার সময় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে তৈরি এসব ‘ইমার্জেন্সি ড্রট প্ল্যান’ প্রকাশ করা হলে জাতীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে পরিবেশবাদী ও পানি অধিকারকর্মীদের বক্তব্য, সংকট যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে, তখন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে সে বিষয়ে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে পানি কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত খরা পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হয়। এসব পরিকল্পনায় খরার বিভিন্ন পর্যায়ে পানি সরবরাহ সচল রাখা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা উল্লেখ থাকে। কিন্তু এর বাইরে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য তৈরি ‘ইমার্জেন্সি ড্রট প্ল্যান’ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। সরকারি নির্দেশিকাতেও এই পরিকল্পনাগুলোকে প্রকাশ্য নথির বাইরে রাখা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি সেই গোপন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের তীব্র শুষ্কতার মধ্যে ইংল্যান্ডের জলাধারগুলোর পানি দ্রুত কমেছে। ২১ জুলাই পর্যন্ত জলাধারগুলোর গড় মজুত ধারণক্ষমতার ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে, যা ওই সময়ের দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ কম। প্রায় অর্ধেক জলাধার স্বাভাবিকের নিচে অবস্থান করছিল এবং কয়েকটি জলাধারকে ‘অস্বাভাবিকভাবে কম’ পর্যায়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
এদিকে এখন ইংল্যান্ডের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং পুরো ওয়েলস খরার মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে হোসপাইপ নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পানি সংকট আরও তীব্র হলে রাস্তার পাশে স্ট্যান্ডপাইপ বসিয়ে পানি সরবরাহ কিংবা নির্দিষ্ট সময় অন্তর পানি দেওয়ার মতো কঠোর ব্যবস্থাও নিতে হতে পারে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পরিকল্পনা গোপন রাখার ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরও অজানা থেকে যাচ্ছে—চরম পানি সংকটে কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে পানি-নির্ভর ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে শিল্পখাতের পানির চাহিদা বাড়ছে। ফলে সংকটের সময় সাধারণ পরিবার, কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তিখাতের মধ্যে পানি বণ্টনের অগ্রাধিকার কী হবে, তা স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
পানি শিল্পের সংগঠন Water UK-ও তীব্র খরার সময়ে কোন খাতে কীভাবে পানি বরাদ্দ করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে একটি সুস্পষ্ট ‘দ্রট হায়ারার্কি’ বা অগ্রাধিকার কাঠামো প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, এমন কাঠামো না থাকলে সংকটের সময় সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত ও স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
সরকার অবশ্য বলছে, জরুরি পরিকল্পনাগুলো গোপন রাখার অর্থ এই নয় যে খরা মোকাবিলায় কোনো প্রস্তুতি নেই। পানি কোম্পানিগুলোকে সংকট মোকাবিলার বিভিন্ন স্তরের জন্য পরিকল্পনা করতে হয় এবং পরিবেশবিষয়ক কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তাদের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ফলে শুধু পানি কোম্পানির গোপন জরুরি পরিকল্পনা নয়, পুরো দেশের পানি নিরাপত্তা নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের মতে, জনগণের কাছে পরিকল্পনার সংবেদনশীল অংশ প্রকাশ না করেও কী ধরনের পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—তার একটি স্বচ্ছ কাঠামো জানানো সম্ভব। তাদের প্রশ্ন, সংকট ঘনিয়ে আসার পর মানুষকে শুধু নিষেধাজ্ঞা ও পানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা দেওয়া হবে, নাকি আগেই জানানো হবে সম্ভাব্য সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার কী করতে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন ব্রিটিশ সরকারের জন্য ক্রমেই বড় রাজনৈতিক ও জনস্বার্থের ইস্যু হয়ে উঠছে।