‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৯ ।। হরিষে বিষাদ

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৪৯ ।। হরিষে বিষাদ

।। হরিষে বিষাদ ।।

উৎসর্গ

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই সব প্রবাসী বাংলাদেশিকে

যাঁদের হৃদয়ে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা আর বুকে জমে আছে অভিমান।

পঁচিশ বছর ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন তবারক হোসেন তুলিপ। এর মধ্যে আটবার দেশে গেছেন। নানান ঝামেলায় দেশে যাওয়া হয়নি খুব বেশি। কিন্তু উনি সারাক্ষানই মনে হয় মনে মনে দেশেই বসববাস করছেন। এবার বারো বছর পর ফিরছেন স্ত্রী মালেকা পারভীন, চৌদ্দ বছরের মেয়ে মালিয়া তাবাসসুম তুসি ও দশ বছরের ছেলে তফাজ্জল হোসেন আলিফকে নিয়ে।

তুলিপের স্ত্রী মালেকা তিন পুরুষের লন্ডনী। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনে। এই প্রথম বাংলাদেশে যাচ্ছেন তিনি। খুবই ধার্মিক মহিলা। স্বামীর ইমামতিতে প্রতিদিন সন্তানদের নিয়ে ঘরে নামাজ পড়েন। আর স্বামী মসজিদে গেলে তিনি নিজেই বচ্চাদের নিয়ে ঘরে নামাজ পড়েন। যেচেই স্বামীর বাড়ির লোকদের নিয়মিত টাকা পাঠান। এদিকে তার নিজের পরিবারের কেউ দেশে নেই। তাই তার পক্ষের কাউকে দেশে টাকা পাঠাতে হয় না। বেশ কয়েক বছর ধরে খুলনার একটা এতিম শিশুর লেখাপড়ার জন্য মাসে দশ পাউন্ড করে তার একাউন্টে পাঠান। দেশের দরিদ্র শিশুদের, অভাবী মহিলাদের ডকুমেন্টারি দেখে মাঝে মাঝে কেঁদেও ফেলেন মালেকা।

তুলিপ সব সময় দেশের কথা ভাবেন। লন্ডনের বাড়িতে বিশাল টিভি স্ক্রিনে স্ত্রী-সন্তানদের বাংলাদেশের বিভিন্ন তথ্যচিত্র দেখান। কখনো গ্রামের বাজার, কখনো সুন্দরবন, কক্সবাজার কিংবা সিলেটের পাহাড় ও চা-বাগান, পদ্মার চর ইত্যাদি। ইউরোপ দেখে কিছু কিছু ইউটিউবার ঢাকা, সিলেট এসব জায়গায় গিয়ে ডকুমেন্টারি বানায়। খুব আগ্রহ নিয়ে তিনি এসব দেখেন। এসব দেখতে দেখতে বাংলাদেশ সম্পর্কে স্ত্রী ও বাচ্চাদের  আগ্রহ আজকাল অনেক বেড়ে গেছে। এখন মালেকা ও সন্তানরা বাংলাদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার প্রস্তাব দেয় মাঝে মাঝে। ওরা এত সুন্দর দেশে স্থায়ীভাবে গিয়ে বাকী জীবন কাটাতে বদ্ধ পরিকর।

তুলিপ মৃদু হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, এবার দেশটা ঘুরে দেখি। তারপর ভাবা যাবে, স্থায়ীভাবে আসব কি না।’

ভাবলেন দেশে কি সেই মানের স্কুল/কলেজ এখন আছে বাচ্চাদের জন্য? দেশে কি নিরাপদে আসলেই থাকা সম্ভব? ব্যবসাপাতি কিছু কি করা যাবে? নাকি চাঁদাভাইদের চাঁদা দিয়ে দিয়ে ফতুর হয়ে সব ছেড়েছুড়ে আবার বিলাতে ফিরে আসতে হবে? স্ত্রী, সন্তানদের তো এসব নিয়ে ভাবনাই আসবার কথা নয়। কিন্তু তিনি তো জানেন তাঁর দেশকে, তার মানুষকে।

দেশে ফেরার আনন্দে পরিবারটি অধীর হয়ে ছিল। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছেই সেই আনন্দে প্রথম ধাক্কা লাগল। ট্রলি নেই মালপত্র নেবার জন্য। অনেকে আবার কারো সাথে কি যেন আলাপ করে হাতে কিছু গুজে দেয়। তারপর কেউ কেউ ট্রলি পাচ্ছে। লাগেজ খুঁজতে খুঁজতে চলে গেল প্রায় দুই ঘন্টা। খারাপ হয়ে গেল সবার মনটা। 

এদিকে লাগেজ পাবার পর দেখা গেল কিছু ছেঁড়া। পাসপোর্ট পরীক্ষা করার সময় এক অফিসার হাসিমুখে ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন, ‘স্যার, খুশি হয়ে পাঁচ-দশ পাউন্ড দেন।’

তুলিপ হতভম্ব হয়ে গেলেন। দায়িত্ব পালনের জন্য আবার খুশি করার টাকা কেন দিতে হবে? প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করলেও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঝামেলায় জড়াতে চাইলেন না। চুপচাপ সামনে এগিয়ে গেলেন টাকা না দিয়েই। 

 সুটকেস নিয়ে টেনেটুনে কোনমতে বাইরে বেরোতেই কয়েকজন লোক ছুটে এল।

‘মামা, দেন! আমরা গাড়িতে তুলে দিচ্ছি। কোনো চিন্তা নাই।’

তুলিপ কিন্তু চিন্তামুক্ত হতে পারলেন না। তাঁদের সাহায্য নিতে চাইলেন না। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, টেক্সির  ড্রাইভার বা এ ধরনের লোকজন প্যাসেঞ্জারদের ‘মামা’ বলে সম্মোধন করছে। পচিশ বছর আগে যখন দেশ ছাড়েন তখন এরকম ছিল না। তাই কিছু কিছু নতুন ‘ভাগিনা’ বারবার সুটকেসের দিকে হাত বাড়াতে লাগল। কে সাহায্য করতে এসেছে, আর কে সুযোগ নিতে চায়, বোঝা কঠিন। কোনো রকমে পরিবার ও মালপত্র সামলে তিনি বাইরে এলেন।

ছোট ভাই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বারো বছর পর ভাইকে দেখে তুলিপের মন আনন্দে ভরে উঠল। কিন্তু গাড়ির কাছে গিয়ে তাঁর হাসি মিলিয়ে গেল।

পুরোনো একটি গাড়ি। পেছনের দিকটা ভাঙাচোরা, সিটবেল্ট নেই। মালপত্র তুলে স্ত্রী-সন্তানদের বসাতেই বেশ অসুবিধা হলো।

তুলিপ জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটাই এনেছিস?’

ভাই অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘এর চেয়ে ভালো গাড়ি খুঁজে পাইনি ভাই। অনেক চেষ্টা করেছি।’

তুলিপ আর কিছু বললেন না। ভাইয়ের সীমাবদ্ধতা তিনি বোঝেন। তবু বারো বছর পর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দেশে ফিরে এমন গাড়িতে চড়তে হবে, ভাবেননি।

গাড়ি চলতে শুরু করল। এয়ারপোর্টে থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যেতেই ইঞ্জিন বন্ধ। বৃদ্ধ ড্রাইভার নেমে বনেট খুলে পরীক্ষা করল। আবার চালু হলো, কিছুক্ষণ পর আবার বন্ধ। এদিকে এমনভাবে সুটকেস গাড়িতে রেখেছে যে একটা ঝাঁকি খেলে সবগুলো মাথায় পড়তে পারে। গাড়ির ভেতরের সাইডের পিসবোর্ড ভাঙা। ভীষণ টেনশনে পড়ে গেলেন দেশে পা দিয়েই। ড্রাইভিং সিটেও কোন সিট বেল্ট নেই।

আলিফ বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আব্বা, গাড়িটা বারবার থেমে যাচ্ছে কেন?’

তুলিপ মৃদু হেসে বললেন, ‘পুরোনো গাড়ি তো, বাবা।’

কিন্তু তাঁর নিজের মুখে হাসি এল না।

আম্বরখানার কাছে এসে গাড়ির ইঞ্জিন আবারও বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার বারবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু গাড়ি চালু হচ্ছে না। ক্লান্ত স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাস্তার পাশে বসে তুলিপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

পঁচিশ বছর ধরে তিনি বিদেশে পরিশ্রম করছেন। পরিবারের প্রয়োজনে নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছেন, আত্মীয়স্বজনের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। দেশের প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ। সেই ভালোবাসা থেকেই সন্তানদের বাংলাদেশের সৌন্দর্য দেখিয়েছেন, যাতে তারা নিজেদের শিকড় চিনতে পারে।

অথচ দেশে পা রাখার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর আনন্দ বিষণ্নতায় রূপ নিয়েছে। বিমানবন্দরে অযাচিত টাকা চাওয়া, লাগেজ নিয়ে ভোগান্তি, আর নিরাপত্তাহীন এই যাত্রা তাঁকে ভাবিয়ে তুলল। রাস্তায় যেভাবে গাড়ি একসিডেন্ট হয় সেটাও তাকে ভাবিয়ে তুললো।

দেশে ফিরলে অনেকেই প্রবাসীর আয়ের হিসাব করেন—কত পাউন্ড আয় করেন, কত টাকা পাঠান, কী উপহার এনেছেন। কিন্তু সেই অর্থ উপার্জনের পেছনে কত পরিশ্রম আর ত্যাগ রয়েছে, তা ভাবেন কজন?

প্রবাসীরা কি শুধু টাকা পাঠানোর যন্ত্র?

এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ বিকট শব্দে গাড়ি চলতে শুরু করলো।

অনেক কষ্টে তাঁরা বাড়ি পৌঁছালেন। আত্মীয়স্বজনের হাসিমুখ দেখে তুলিপের মন কিছুটা ভালো হলো। মালেকা ও সন্তানদের সামনে বাংলাদেশের অনেক কিছু দেখা বাকি। হয়তো দেশের প্রকৃতি ও মানুষের আন্তরিকতা তাঁদের মন জয় করবে।

বাড়ি ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরলেন। মার দুচোখ বেয়ে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। বিদেশী বউমা আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর খুশি দেখে কে? চৌদ্দ আইটেমের রান্নার আয়োজন। অনেকেই আসলেন দেখা করতে। ভাইবোন সবাই খুশিতে ডগমগ।

রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর তুলিপ ভাবলেন, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফেরার স্বপ্ন কি বাস্তবায়ন করা কি এদেশে আদৌ সম্ভব হবে? সকালে মাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে।

তিনি জানেন, একটি পুরোনো গাড়ি দিয়ে গোটা দেশের উন্নয়ন বিচার করা যায় না। কিন্তু উন্নয়নের সুফল যদি যাত্রীর নিরাপত্তা, সম্মান ও সেবায় প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ তা অনুভব করবে কীভাবে?

সকালে মাকে দেশে স্থায়ী হবার বিষয়টি খুলে বললেন। মা অবাক হয়ে বললেন, বাবা, বউমা মাটির মানুষ। আর তোর ছেলেমেয়েরাও খুব সরল সোজা। এদেশে তুই এদের নিয়ে থাকতে পারবি না। আমরা যে কত আরামে আছি তা তো আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। জীবনেও এ কাজ করিস না। এখানে কি লন্ডনের মতো স্কুল পাবি? এতদিন পর দেশে এসে কি দেশের মানুষের সাথে মিলেমিশে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবি? মোটেই পারবি না। এখন ঘুষ ছাড়া কিছুই করা যায় না। খুব কঠিন হয়ে গেছে সব। গত পচিশ বছর আগে যেভাবে রেখে গিয়েছিলি দেশটা আর সেভাবে নেই। এই তো, ওই পাড়ার মহসিন সাহেব তোর মতো চিন্তা করে ছয় মাস পর সব ছেড়েছুড়ে আবার বিলাতে চলে গেলেন। নানা ঝামেলারে বাবা এখন দেশে। তোরা আরামে আছিস, বিদেশেই থাক। মাঝে আমাদের দেখে যাইস। বড় বোনরাও দেখা গেল মায়ের কথায় সায় দিলেন প্রবলভাবে।

মায়ের কথার পর তুলিপের সম্বিৎ ফিরে এলো। আসলেও তো তাই। স্থায়ী হওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। স্ত্রী, সন্তানদের বুঝাতে হবে। মাঝে মাঝে এভাবে দেশে বেড়াতে আসা যাওয়া যায়, কিন্তু প্রবাসীদের আর স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। এটা ‘ওয়ানওয়ে টিকিট’। 

তুলিপ শুধু অভিমান করে থাকতে চান না। তিনি মনে করেন, প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, উন্নত যাত্রীসেবা, নিরাপদ পরিবহন ও জবাবদিহির দাবি জানানো উচিত। প্রতিবাদের লক্ষ্য হওয়া দরকার কার্যকর পরিবর্তন; এমন কিছু নয়, যাতে দেশের সাধারণ মানুষ অকারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের সবকিছু নীরবে মেনে নেওয়া নয়। দেশের ভুলগুলো সংশোধনের দাবি জানানোও ভালোবাসার অংশ।

তুলিপের মনে একটি প্রশ্ন থেকেই গেল—যে মানুষটি পঁচিশ বছর বিদেশে পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, বারো বছর পর দেশে ফেরার দিনে তাঁর প্রাপ্য কি শুধু হয়রানি, অনিশ্চয়তা আর বিষণ্নতা?

প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির শক্তি, কিন্তু তাঁরা টাকা তৈরির যন্ত্র নন। তাঁরাও মানুষ; তাঁদেরও সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা পাওয়ার অধিকার আছে।

তুলিপ দেশে ফিরেছিলেন বুকভরা আনন্দ নিয়ে। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বাড়ি পৌঁছানোর পথেই সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে গেল গভীর অভিমান। হরিষ বা আনন্দটা পরিনত হলো বিষাদে।

লন্ডন, ১৯ অক্টোবর ২০২৬