আইনের নামে বৈধ সহিংসতা: আফগান নারীদের জীবনে নতুন অন্ধকার অধ্যায়

আইনের নামে বৈধ সহিংসতা: আফগান নারীদের জীবনে নতুন অন্ধকার অধ্যায়

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১৯ ফেব্রুয়ারি: আফগানিস্তানে আবারও কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হলো নারী সমাজ। তালেবান শাসন নতুন এক দণ্ডবিধি কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে স্বামীদের স্ত্রী ও সন্তানদের “শারীরিক শাস্তি” দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুধু একটি শর্ত—মারধরে হাড় না ভাঙা কিংবা দৃশ্যমান গুরুতর জখম না হওয়া।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দি টেলিগ্রাফ জানায়, ৯০ পাতার এই নতুন দণ্ডবিধিতে স্বাক্ষর করেছেন তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। পশতু ভাষায় ‘দ্য মাহাকুমু জাজাই উসুলনামা’ নামে পরিচিত এই নথি ইতোমধ্যে আফগানিস্তানের বিভিন্ন আদালতে বিতরণ করা হয়েছে। এর একটি অনুলিপি পেয়েছে ‘দি ইনডিপেনডেন্ট’

“অতিরিক্ত শক্তি” ব্যবহার—মাত্র ১৫ দিনের শাস্তি

নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো স্বামী যদি ‘অতিরিক্ত মাত্রার শক্তি’ প্রয়োগ করে দৃশ্যমান জখম বা হাড় ভাঙার কারণ ঘটান, তবে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড। তবে সেটিও তখনই কার্যকর হবে, যদি নির্যাতিত স্ত্রী আদালতে গিয়ে নির্যাতনের প্রমাণ দিতে পারেন।

আর প্রমাণের পথটিও সহজ নয়। নারীকে সম্পূর্ণ হিজাব পরা অবস্থায় বিচারকের সামনে জখম দেখাতে হবে, এবং তার সঙ্গে অবশ্যই থাকতে হবে তার স্বামী অথবা প্রাপ্তবয়স্ক কোনো পুরুষ অভিভাবক। অর্থাৎ অভিযোগের মঞ্চেও নারীর স্বাধীনতা নেই।

অনুমতি ছাড়া বেড়াতে গেলেই জেল

দণ্ডবিধিতে আরও বলা হয়েছে, বিবাহিত কোনো নারী স্বামীর অনুমতি ছাড়া আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে তার সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এখানে অপরাধে পরিণত হয়েছে।

আইনে শ্রেণিবিভাজন

সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো—আইনের ভেতরেই শ্রেণিভিত্তিক শাস্তির বিধান। আফগান সমাজকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: উলামা (ধর্মীয় বিদ্বান), আশরাফ (অভিজাত), মধ্য শ্রেণি এবং নিম্ন শ্রেণি।

একই অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারিত হবে অপরাধের মাত্রা দিয়ে নয়, বরং অভিযুক্তের সামাজিক অবস্থান দিয়ে।

  • যদি কোনো ধর্মীয় পণ্ডিত অপরাধ করেন, তার শাস্তি সীমাবদ্ধ থাকবে পরামর্শে।

  • আশরাফ শ্রেণির কেউ হলে তাকে আদালতে ডেকে সতর্ক করা হবে।

  • মধ্য শ্রেণির ব্যক্তিকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

  • আর নিম্ন শ্রেণির ক্ষেত্রে একই অপরাধে কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তিও হতে পারে।

এই কাঠামো কার্যত আইনের চোখে সমতার ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই দণ্ডবিধি নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধের মুখে থাকা আফগান নারীদের জন্য এটি আরও এক ধাপ পেছনে ফেরা।

তালেবান সরকার বরাবরই দাবি করে এসেছে, তারা “ইসলামি শরিয়াহ” অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করছে, এটি মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

এই আইনের মাধ্যমে পরিবার নামের কাঠামোর ভেতরেই সহিংসতার একটি সীমারেখা টেনে দেওয়া হলো—যেখানে নির্যাতন “মাপজোকের” বিষয়। আফগান নারীদের জন্য এটি কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার ওপর নতুন করে আরোপিত নিয়ন্ত্রণ।

আইনের ভাষা যতই আনুষ্ঠানিক হোক, বাস্তবতায় এর প্রভাব পড়বে ঘরের ভেতর—অদৃশ্য দেয়ালের আড়ালে। আর সেই দেয়াল পেরিয়ে কত কণ্ঠস্বর আদালত পর্যন্ত পৌঁছাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।