কূটনীতি, কৌশল নাকি রাজনৈতিক সমঝোতা? খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রে আনার নেপথ্যের হিসাব

কূটনীতি, কৌশল নাকি রাজনৈতিক সমঝোতা? খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রে আনার নেপথ্যের হিসাব

ভয়েস অব পিপল অনুসন্ধানী রিপোর্ট ১৯ ফেব্রুয়ারি:  অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থেকে সরাসরি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব—ড. খলিলুর রহমানের এই উত্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নীরব আলোড়ন তুলেছে। বিষয়টি শুধু একটি নিয়োগ নয়; এটি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আস্থার বিনিময়, কৌশলগত বার্তা এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্র দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত বহন করছে।

বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছে—অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা একজন ব্যক্তি কীভাবে এত দ্রুত একটি দলীয় সরকারের মূল মন্ত্রণালয়ে স্থান পেলেন? তাদের দাবি, এতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা ভিন্ন যুক্তি দিচ্ছেন। তাদের মতে, বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব, রোহিঙ্গা সংকট, এমনকি সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা-রাজনীতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর অত্যন্ত জটিল। এমন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগসম্পন্ন এবং কূটনৈতিক ভাষা বোঝেন—এমন কাউকে দরকার ছিল।

লন্ডন বৈঠক: অঘোষিত সেতুবন্ধন?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ফিরে তাকাচ্ছেন গত বছরের জুন মাসের দিকে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনুস লন্ডনে গিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠক থেকেই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা আসে—এমনটাই প্রচলিত রাজনৈতিক ধারণা।

সেই সফরে খলিলুর রহমানের উপস্থিতি এখন নতুন করে আলোচনায়। সাবেক কয়েকজন কূটনীতিক মনে করেন, ওই বৈঠক শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খুলেনি, বরং ব্যক্তিগত আস্থার সম্পর্কও পুনর্গঠন করেছে। তাদের দাবি, সেই সময় থেকেই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়।

পুরোনো প্রশাসনিক সূত্র

খলিলুর রহমান ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি লুৎফুর রহমান-এর একান্ত সচিব ছিলেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার অভিজ্ঞতা তখনই অর্জন করেন বলে অনেকে মনে করেন। বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে তার পরিচয়ের সূত্রপাতও সেখানেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক চাপ ও নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হলে অন্তর্বর্তী সরকার চাপে পড়ে। বিএনপি তখন নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি চেয়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়। সেই উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে খলিলুর রহমানের ভূমিকা কী ছিল—এ প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।

তার ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, তিনি আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রেখে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় করেছেন এবং একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ বাস্তবায়নে নীরব ভূমিকা রেখেছেন। তবে সমালোচকরা বলছেন, যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

কেন এখন পররাষ্ট্র?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমানে শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অবস্থানের কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শ্রমবাজার ও মানবাধিকার সংলাপ, চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ও পানিবণ্টন ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার—সব ক্ষেত্রেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, খলিলুর রহমানের নিয়োগের মাধ্যমে বিএনপি সরকার আন্তর্জাতিক মহলে একটি বার্তা দিতে চায়—তারা অভিজ্ঞ ও পেশাদার কূটনীতিকে প্রাধান্য দেবে। একই সঙ্গে এটি দলের ভেতরে একটি আস্থার ইঙ্গিত—সংকটকালে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ক্ষমতায় এসেও তা অস্বীকার করা হয় না।

ভেতরের দ্বিধা

তবে দলীয় পর্যায়ে কিছু নেতাকর্মী অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্ন তুলছেন—দীর্ঘদিনের ত্যাগী রাজনীতিকদের বাইরে রেখে একজন আমলাতান্ত্রিক পটভূমির ব্যক্তিকে এত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেওয়া কতটা রাজনৈতিকভাবে সঙ্গত? এতে কি দলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়বে?

সামনে কী?

ড. খলিলুর রহমান এখন এমন এক অবস্থানে, যেখানে তাকে শুধু কূটনৈতিক দক্ষতা নয়, রাজনৈতিক আস্থাও প্রমাণ করতে হবে। তার সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করা এবং দেশের ভেতরে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিতর্কের জবাব দেওয়া।

এই নিয়োগ কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন নয়। এটি ক্ষমতার অন্দরমহলের সম্পর্ক, কৌশলগত সমঝোতা এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্র নীতির রূপরেখার ইঙ্গিত। সময়ই বলবে—এটি ছিল দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক প্রয়োজনের ফল।