কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৯ ।। নতুন সরকার ও জনগণের প্রত্যাশা: দায়িত্বের অঙ্গীকার

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৯ ।। নতুন সরকার ও জনগণের প্রত্যাশা: দায়িত্বের অঙ্গীকার

উৎসর্গ

“এই কলাম উৎসর্গ করা হলো সেই সব নেতা ও দায়িত্বশীল নাগরিককে, যারা দেশের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক উন্নয়নে অক্লান্তভাবে কাজ করতে আগ্রহী।”

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের মুখে দাঁড়িয়ে। নির্বাচনে নিরংকুশ বিজয়ের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখন সাধারণ মানুষ শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন চাইছে না—তারা চায় বাস্তব পরিবর্তন। মানুষের আশা স্পষ্ট। নতুন সরকারকে কয়েকটি বিশেষ মূল ক্ষেত্রে সফল হতে দেখার প্রত্যাশা রয়েছে।

এই ক্ষেত্রগুলোকে আমরা সহজভাবে বলতে পারি—আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নারীর নিরাপদ চলাচল, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, অতীতের নির্যাতন ও নিপীড়নের বিচার, লুটপাট ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের ব্যবস্থা, এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি। এগুলো কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এগুলো মানুষের ন্যায্য অধিকার, তাদের জীবনের মান এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রীসভার মিটিং

আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নাগরিকরা চায়, অপরাধ যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করতে না পারে। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা মানে মানুষকে নিজস্ব কণ্ঠ প্রকাশ করার সুযোগ দেওয়া, যা গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত রাখে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ—এগুলো জনগণের জীবনের উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যদি মানুষ প্রতিদিনের খাদ্য, পরিবহন বা জীবিকায় উদ্বিগ্ন থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ চায় সড়কে নিরাপত্তা। মানুষ চায় অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ হোক। মানুষ নিরাপদে ঝামেলামুক্তভাবে ব্যবসা বাণিজ্য করে দু‘বেলা দু‘মুঠো ভাতের জোগান করতে চায়। মানুষ চায় চাকুরী ঢুকতে জায়গা-জমি বিক্রি করে যেন ঘুষ না দিতে হয়।

নারীর নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করা, এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা—এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নারীর নিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিশ্চিন্ত চলাচল নিশ্চিত না হলে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ কেবল কাগজে-কলমে সীমিত থেকে যাবে। এগুলো সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

অতীতের লুটপাট ও দুর্নীতির ইত্যাদি মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। তাই এই সরকারের কাছে সাধারণ জনগণ কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায়। অর্থাৎ নতুন সরকারের কথা ও  কাজে মিল দেখতে চায়।

নতুন সরকারের হাতে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—শুধু প্রশাসন চালানো নয়, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। মানুষ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—“আমরা কথা চাই না, আমরা চাই বাস্তব পরিবর্তন।” এই কয়েকটি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা মানে কেবল রাজনৈতিক জয় নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়।

সুতরাং পরিশেষে বলা যায়, দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর কতটা স্থায়ী হবে, তা এখন নতুন সরকারের হাতে। যদি তারা জনগণের আস্থা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক জয় নয়; এটি দেশের জন্য এক নতুন, স্থায়ী ও দায়িত্বশীল সরকারের সূচনা হবে।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও অধ্যাপক

লন্ডন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬