শুল্ক কমে ১৯ শতাংশ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি জানাল অন্তর্বর্তী সরকার

শুল্ক কমে ১৯ শতাংশ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি জানাল অন্তর্বর্তী সরকার

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ১৫ ফেব্রুয়ারি:  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কিছু অংশ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলায় অনুবাদ করে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ও আলোচনার সূচনা

চুক্তির প্রকাশিত অংশে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭-এর মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ জানান।

পাল্টা শুল্ক আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্র একটি অভিন্ন শুল্ক চুক্তির খসড়া বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোকে পাঠায়। আলোচনায় অংশ নেওয়া দেশগুলোর জন্য ৩০ আগস্ট নতুন শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়—যেখানে বাংলাদেশের জন্য হার দাঁড়ায় ২০ শতাংশ।

৯ মাসের আলোচনায় শুল্কহার কমে ১৯ শতাংশ

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ৯ মাস ধরে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
এই আলোচনায় নেতৃত্ব দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি এনবিআর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।

চুক্তিতে বিস্তৃত বাণিজ্য কাঠামো

প্রকাশিত অংশ অনুযায়ী, চুক্তিতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ পূর্বেই ডব্লিউটিও, আইএলও ও ট্রিপসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য হওয়ায় নতুন কোনো অতিরিক্ত শর্ত আরোপিত হয়নি।

বাংলাদেশের বাজার সুরক্ষায় উৎস পরিবর্তনের কৌশল

চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে—সেগুলো বাংলাদেশ অন্য উৎস থেকেও কিনে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার হওয়ায় বাজার ধরে রাখতে উৎস পরিবর্তনের মাধ্যমে আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে না।

টেক্সটাইল খাতে বিশেষ সুবিধা

চুক্তিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি পোশাক রফতানি করলে শূন্য শুল্কে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক হওয়ায় এ সুবিধা খাতটিকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে।

২৫০০ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা

চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২৫০০ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ওষুধ
  • কৃষিপণ্য
  • প্লাস্টিক
  • কাঠ ও কাঠজাত পণ্য
  • অন্যান্য শিল্পপণ্য

অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ৭১৩২টি ট্যারিফ লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে—

  • ৪৯২২টি ট্যারিফ লাইন তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত
  • ১৫৩৮টি ট্যারিফ লাইন ৫ বছরে শূন্য শুল্ক
  • ৬৭২টি ট্যারিফ লাইন ১০ বছরে শূন্য শুল্ক
  • ৩২৬টি ট্যারিফ লাইন শুল্কমুক্ত নয়

ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের এই কাঠামো অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে দেখা যায়নি—যা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সুবিধাজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিজিটাল ট্রেড, আইপিআর, কৃষি ও বিনিয়োগে নতুন সুযোগ

চুক্তিতে আরও রয়েছে—

  • পেপারলেস ট্রেড
  • আইপিআর এনফোর্সমেন্ট
  • ই-কমার্সে স্থায়ী স্থগিতাদেশ সমর্থন
  • নন-ট্যারিফ বাধা হ্রাস
  • মার্কিন এফডিএ সনদ থাকলে ওষুধ ও মেডিক্যাল ডিভাইস আমদানির অনুমতি
  • কৃষিজ পণ্যে মার্কিন এসপিএস মেজার্স স্বীকৃতি
  • তেল, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা শিথিলকরণ
  • পরিবেশ ও শ্রম আইন হালনাগাদে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ

এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে প্রস্থান ধারা যুক্ত করা হয়েছে—যা অন্যান্য দেশের চুক্তিতে নেই।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।