তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা: অর্ধেকসংখ্যক পূর্ণমন্ত্রী দায়িত্বে

তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা: অর্ধেকসংখ্যক পূর্ণমন্ত্রী দায়িত্বে

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৯ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে—দেশে মোট কতটি মন্ত্রণালয় রয়েছে এবং সেই তুলনায় মন্ত্রিসভার আকার কেমন হওয়া উচিত—এ বিষয়টি প্রায়ই আলোচনায় আসে। সরকারি নথি ও প্রশাসনিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মোট প্রায় ৫০–৫১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উৎসে এই সংখ্যা ৪১ বা ৪৩ বলা হলেও, সর্বশেষ প্রশাসনিক বিন্যাস অনুযায়ী প্রায় ৫১টি মন্ত্রণালয়/ডিভিশনই কার্যকর কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী সরকার পরিচালিত হয় প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বনাম পূর্ণমন্ত্রীর সংখ্যা।

প্রচলিত প্রশাসনিক রীতি অনুযায়ী, প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের জন্য একজন পূর্ণমন্ত্রী (Cabinet Minister) থাকেন। সেই হিসাবে, যদি দেশে ৫০–৫১টি মন্ত্রণালয় থাকে, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে ৫০–৫১ জন পূর্ণমন্ত্রী থাকার কথা। পাশাপাশি, কাজের চাপ ও দায়িত্বের বিস্তার অনুযায়ী প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে এক বা একাধিক প্রতিমন্ত্রী (State Minister বা Junior Minister) থাকতে পারেন। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়; সরকারের প্রয়োজন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা নির্ধারিত হয়।

কিন্তু বর্তমান সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের পর প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। নতুন মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ২৪ জন। প্রধানমন্ত্রীর পদসহ মোট মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। আর ১০ জন আছে মন্ত্রীর পদ মর্যাদায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়—মোট মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা প্রায় ৫০–৫১টি হলেও পূর্ণমন্ত্রীর সংখ্যা রাখা হয়েছে ২৫ জন। অর্থাৎ, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন পূর্ণমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত হয়েছে, অথবা কিছু ক্ষেত্রে বিভাগীয় কাঠামো একীভূত করে পরিচালনা করা হতে পারে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আনা কিংবা রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা—এ ধরনের বিভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

সরকারি কাঠামো অনুযায়ী সম্ভাব্য চিত্র এবং বর্তমান বাস্তব মন্ত্রিসভার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়—

মোট মন্ত্রণালয়/ডিভিশন: প্রায় ৫০–৫১টি
তাত্ত্বিকভাবে পূর্ণমন্ত্রী থাকা উচিত: ৫০–৫১ জন
বর্তমানে পূর্ণমন্ত্রী: ২৫ জন
বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী: ২৪ জন
মোট সদস্য (প্রধানমন্ত্রীসহ): ৫০ জন

ইতিবাচক দিকসমূহ

১.প্রশাসনিক খরচ কমানো
পূর্ণমন্ত্রীর সংখ্যা অর্ধেকে রাখার ফলে বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সরকারি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এটি সরকারের বাজেট পরিচালনায় সহায়ক।

২. দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ
ছোট মন্ত্রিসভা মানে নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কম স্তর দিয়ে দ্রুত করা সম্ভব। বড় মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগে।

৩.দায়িত্ব ভাগাভাগি ও দক্ষতা
কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের হাতে দিয়ে একাধিক পদে দক্ষতার সুবিধা নেওয়া যায়। প্রশাসনিক দায়িত্বকে কেন্দ্রীয়করণ না করে কার্যক্রমকে মসৃণ করা সম্ভব।

৪.রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা
পূর্ণমন্ত্রীর সংখ্যা কম রাখলে, রাজনৈতিক সমীকরণ ও দলীয় সমর্থন অনুযায়ী প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা নিযুক্ত করার মাধ্যমে সমন্বয় করা সহজ হয়।

নেতিবাচক দিকসমূহ

১.প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বিশেষায়িত মনোযোগের অভাব
একজন পূর্ণমন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলে, নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক মনোযোগ বণ্টন সীমিত হতে পারে। এর ফলে কিছু বিভাগে নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হতে বিলম্ব হতে পারে।

২. দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার অস্পষ্টতা
পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি করার ফলে কখনও জবাবদিহিতার অস্পষ্টতা দেখা দিতে পারে। কোন সিদ্ধান্তের দায় কার, তা স্পষ্ট না হলে প্রশাসনিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

৩. রাজনৈতিক চাপের সম্ভাবনা
ছোট মন্ত্রিসভায় কম পূর্ণমন্ত্রী থাকলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সীমিত হয়ে যেতে পারে। এতে কিছু রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্ক জন্ম নিতে পারে।

৪. জনসচেতনতা ও স্বচ্ছতা সীমিত হতে পারে
সাধারণ মানুষ কখনও বুঝতে পারেন না কোন মন্ত্রী কোন দায়িত্বে দায়িত্বশীল। ফলে স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা কমে যেতে পারে।

সংক্ষেপে বলা যায়, বর্তমান মন্ত্রিসভার আকার বাজেট ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার জন্য সুবিধাজনক, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়ন ও দায়বদ্ধতার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। এটি প্রশাসনিক দক্ষতা বনাম নীতি নির্ধারণের গভীরতা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টার ফলাফল।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারি কাঠামোতে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা প্রায় ৫০–৫১ হলেও বাস্তবে বর্তমানে অর্ধেকসংখ্যক পূর্ণমন্ত্রী দিয়ে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। দায়িত্ব বণ্টনের ধরন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ—এই তিনটির সমন্বয়েই বর্তমান মন্ত্রিসভার রূপ নির্ধারিত হয়েছে।